আইপিএল স্থগিতের জেরে বিশাল আর্থিক ক্ষতি বিসিসিআইয়ের, চলছে খামতি অনুসন্ধান
করোনা পরিস্থিতির জেরে আজই বিসিসিআই আইপিএল স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জৈব সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে থেকেও বিভিন্ন দলের ক্রিকেটাররা করোনা আক্রান্ত হতেই বোর্ডের এই পদক্ষেপ। যার জেরে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে বিসিসিআইকে। ফ্র্যাঞ্চাইজি ও বিজ্ঞাপনদাতাদেরও। কেন এমন হলো চলছে তার কারণ অনুসন্ধান।

বোর্ডের বিপুল ক্ষতি
৫২ দিনে ৬০টি ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল আইপিএলে। ৩০ মে আমেদাবাদে ছিল ফাইনাল। কিন্তু করোনার থাবায় আইপিএল স্থগিত করে দেওয়া হলো ২৪ দিনে ২৯টি ম্যাচ হওয়ার পরেই। বিসিসিআইয়ের এক কর্তার দাবি, এতে বোর্ডের অন্তত ২২০০ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হলো। যার বেশিরভাগটা সম্প্রচারের স্বত্ত্বাধিকারী স্টার স্পোর্টসের থেকেই। বোর্ডের সঙ্গে আইপিএল দেখানোর ক্ষেত্রে স্টারের চুক্তি পাঁচ বছরে ১৬,৩৪৭ কোটি টাকার, অর্থাৎ প্রতি বছরে ৩২৬৯.৪ কোটি টাকার। যদি ৬০টি ম্যাচ হতো তাহলে বোর্ডকে স্টারের দিতে হতো ম্যাচ প্রতি ৫৪.৫ কোটি টাকা। ২৯টি ম্যাচের ক্ষেত্রে তাই বোর্ড পাবে ১৫৮০ কোটি টাকা। ফলে এখানেই ক্ষতি ১৬৯০ কোটি টাকার। টাইটেল স্পনসর ভিভোর কাছ থেকে বোর্ডের প্রতি আইপিএলে পাওয়ার কথা ৪৪০ কোটি টাকা। এবার তাই অর্ধেকেরও কম পাবে। আনঅ্যাকাডেমি, ড্রিম ইলেভেন, সিআরইডি, আপস্টক্সের মতো অ্যাসোসিয়েট স্পনসরদের প্রত্যেকের থেকে আইপিএলে বোর্ড ১২০ কোটি টাকা করে পায়। আইপিএল পুরো না হওয়ায় সেটাও ক্ষতির পরিমাণ বাড়াল। এ ছাড়াও আরও কয়েকটি স্পনসরের থেকে চুক্তি বাবদ পুরো টাকা পাবে না বিসিসিআই। এর ফলে বোর্ডের কাছ থেকে আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজিরা যে পরিমাণ টাকা পায় সেই সেই সেন্ট্রাল রেভিনিউ পুলেও এই ধাক্কা লাগল জোরালোভাবেই। ফ্র্যাঞ্চাইজিদের ক্ষতির পরিমাণও এখনও স্পষ্ট নয়। আইপিএল মাঝপথে থমকানোয় কোপ পড়বে ক্রিকেটারদের প্রাপ্য অর্থেও।
(ছবি- বিসিসিআই/আইপিএল)

সিদ্ধান্ত স্বাগত ফ্র্যাঞ্চাইজিদের
বোর্ডের আইপিএল স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজিরা। সকলেই জানিয়েছে, বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করেই ক্রিকেটারদের সুরক্ষিতভাবে নিজেদের বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা করা হবে। জানা গিয়েছে, ট্র্যাভেল ব্যান থাকায় অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটাররা আপাতত মালদ্বীপে যাবেন। তবে এর মধ্যেই অনেকে অবাক তথ্য গোপনের চেষ্টা দেখে। কেন না, আজ সানরাইজার্স হায়দরাবাদের ঋদ্ধিমান সাহা বা দিল্লি ক্যাপিটালসের অমিত মিশ্র করোনা পজিটিভ ধরা পড়লেও সে কথা কোনও দলই সরকারিভাবে জানায়নি। কেন এমনটা হলো সেটা নিয়ে চর্চা চলছে। কেকেআরের বরুণ চক্রবর্তী ও সন্দীপ ওয়ারিয়র করোনা পজিটিভ ধরা পড়ার পর করোনা থাবা বসায় চেন্নাই সুপার কিংসের সংসারে। প্রথমে জানা যায় দলের সিইও কাশী বিশ্বনাথন, বোলিং কোচ লক্ষ্মীপতি বালাজি ও এক বাসকর্মী করোনা পজিটিভ হয়েছেন। যদিও আজ চেন্নাই সুপার কিংস সরকারিভাবে জানায় বালাজি ও বাসকর্মী করোনা পজিটিভ, তাঁরা আইসোলেশনে রয়েছেন। তবে ঋদ্ধি বা অমিতের কথা তাঁদের ফ্র্যাঞ্চাইজিরা জানায়নি।
(ছবি- বিসিসিআই/আইপিএল)

কার্যত বাতিলই
আইপিএল স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে জানিয়েছেন প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিন। তবে আরেক প্রাক্তন কারসেন ঘাউড়ি সাফ জানিয়েছেন, ভারতে আইপিএল আয়োজনই উচিত হয়নি এবার। ভারতে যেভাবে সংক্রমণ ছড়িয়েছে তাতে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী বা অন্য কোথাও আইপিএল আয়োজন করাই যেত। ভারতীয় দল জুন মাসে ইংল্যান্ড সফরে যাবে। সেখানে আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল খেলার পর দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ ও পাঁচ টেস্টের সিরিজ খেলে বিরাট কোহলিরা দেশে ফিরবেন সেপ্টেম্বরে। টি ২০ বিশ্বকাপ শুরুর কথা অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে। যদিও তা ভারতে হওয়া নিয়ে সংশয় আরও জোরালো হয়েছে। বোর্ডের একাংশও মনে করছেন, নভেম্বরে তৃতীয় ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে। ফলে ভারতে কোনও গ্লোবাল ইভেন্ট আয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ হবেই, বিশেষ করে এবারের আইপিএল অভিজ্ঞতার নিরিখে। টি ২০ বিশ্বকাপের আগে নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তিনটি করে টি ২০ খেলার কথা ভারতের। তাছাড়া টি ২০ বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুত হবে অন্য দলও। তাই সেপ্টেম্বরে ছোটো উইন্ডো থাকলেও আইপিএল আয়োজনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বিশ্বকাপের পর আবার ভারত নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজও খেলবে।
(ছবি- বিসিসিআই/আইপিএল)

খামতি খোঁজার পালা
জানা গিয়েছে, আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের তরফে এবারের আইপিএলও সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। রাজি ছিল অন্তত চারটি ফ্র্যাঞ্চাইজিও। যদিও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ আয়োজনের পর আত্মবিশ্বাসী ভারতীয় বোর্ড সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। অথচ গতবারের তুলনায় এবার জৈব সুরক্ষা বলয়েই খামতি ছিল। বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি সূত্রে জানা গিয়েছে, গত আইপিএলে যেভাবে কেন্দ্রীয়ভাবে জৈব সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হয়েছিল এবার তা হয়নি। শুধু একটি হাসপাতাল ও টেস্টিং ল্যাবরেটরি ছাড়া কিছু ছিল না। এমনও হয়েছে একটি দলকে একটি মলে থাকতে হয়েছে। একটি হোটেল ছেড়ে যাওয়ার ১২ দিন পরে সেখানেই ফিরতে হয়েছে। দেখা গিয়েছে, যাঁদের সংক্রমণ ধরা পড়েছে তা হয়েছে বিমানযাত্রার পরেই। গত বছর দলগুলিকে বিমানযাত্রা করতে হয়নি। জৈব সুরক্ষা বলয় জমাট থাকায় কোনও সমস্যাও হয়নি সেবার। মাঠকর্মীদের প্রয়োজন হয় অনুশীলনের সময়। তাঁদেরও ক্রিকেটারদের জৈব সুরক্ষা বলয়ে রাখায় হয়নি। ফলে অনেক ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয়েছে দলগুলিকে। মাঠকর্মী, পরিবহণকর্মীদের জন্য বায়ো বাবল না থাকায় তাঁদের অনেকেও সংক্রমিত হয়েছেন। জিপিএস ট্র্যাকিংও ছিল ত্রুটিপূর্ণ। পৃথক বায়ো বাবল করেই বিপদ এড়ানো গেল না বলে মনে করছেন অনেকে।
(ছবি- বিসিসিআই/আইপিএল)












Click it and Unblock the Notifications