ঋতুপর্ণ ঘোষ নেই আজ ছ'বছর; সামাজিক দ্বিচারিতাগুলিকে একটানে বে-আব্রু করা ছিল বাঁ-হাতের খেল
আজ ৩০ মে, বিশিষ্ট চিত্র পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। অবশ্য ঋতুপর্ণকে শুধু চিত্র পরিচালক বললে কম বলা হবে।
আজ ৩০ মে, বিশিষ্ট চিত্র পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। অবশ্য ঋতুপর্ণকে শুধু চিত্র পরিচালক বললে কম বলা হবে। তাঁকে এক কথায় প্রতিভা বললেই সবচেয়ে ভালো হয় কারণ পড়াশোনা, নির্দেশনা, মিডিয়া ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর মতো জ্ঞানীগুণী মানুষ বঙ্গসমাজে আজকাল খুব বেশি দেখা যায় না। ২০১৩ সালে মাত্র ৪৯ বছর বয়েসে ঋতুপর্ণ ইহলোক ত্যাগ করেন অসুস্থতার কারণে।

ঋতুপর্ণর মূল্যায়নে যে কথাটি বেশি করে উঠে আসে তা হল সত্যজিৎ ও মৃণাল সেনের ধারক ও বাহক ছিলেন তিনিই। চলচ্চিত্রকে শহুরে নীতিপরায়ণ দর্শকের মধ্যে ফের জনপ্রিয় করে তোলার কৃতিত্বও দেওয়া হয় তাঁকে, বিশেষ করে সত্যজিতের প্রয়াণের পরে।
ইন্টেলেকচুয়াল অর্থে ঋতুপর্ণের অবদান নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই, থাকবার কথাও নয়। তাঁকে মঞ্চে মঞ্চে ভেংচানোর জন্যে কৌতুকাভিনেতা ও সঞ্চালক মীরকে তিনি তাঁর টক শো-তে যেভাবে চেপে ধরেছিলেন এক দশক আগে, তাতে বাঙালি ইন্টেলেকচুয়ালিজম-এর একটি চূড়ান্ত বহির্প্রকাশ ঘটে বলে অনেকের ধারণা, বিশেষ করে 'মাস'-কেন্দ্রিক চটুল বিনোদনের পরিপন্থী হিসেবে।
সামাজিক দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে ঋতুপর্ণের মন্তব্য ছিল চোখে পড়ার মতো
কিন্তু ঋতুপর্ণর মূল্যায়ন শুধুমাত্র ইন্টেলেকচুয়াল-এর মধ্যে রাখলে চিত্র সম্পূর্ণ হয় না। তিনি তাঁর সমকালীন বা পিরিয়ড-ধর্মী ছবিতে আগেকার সমাজের ভিতরের নানা ঘাত-প্রতিঘাত-এর বিষয়গুলি নিজের ছবিতে ফুটিয়ে তুলতেন অসামান্য দক্ষতায়। এদিক থেকে সত্যজিতের মতোই ধারালো ছিল তাঁর অন্তর্দৃষ্টি। 'উৎসব' ছবিতে বাড়ির সকলের কাছে ছোট মেয়ের প্রেম নিয়ে যেভাবে তাঁকে অসম্মান করা হয় এবং বহুবছর পরে বসতবাড়ি বিক্রি করার তাগিদে তাঁর পুরোনো প্রেমিককে আপ্যায়ন করা হয় ফের সেই পরিবারের ভিতরে এবং সেই সামাজিক দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে মেয়েটির (তখন সে মা) প্রতিবাদ এক লহমায় আমাদের ভিতরটা নাড়িয়ে দেয়। ঋতুপর্ণের মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের দিকগুলিকে জোরালো বার্তা সহ পর্দায় ফুটিয়ে তোলার এই দুর্দান্ত গুণটিকে আজ আর দেখতে পাওয়া যায় না বিশেষ। রাজনৈতিক মন্তব্য হয়তো সেভাবে তিনি করতেন না কিন্তু সামাজিক অসাম্য বা অন্যায়ের দিকগুলিকে প্রস্ফুটিত করার মতো পটুতাতে তিনি ছিলেন অসামান্য।
ঋতুপর্ণ মানেই কন্টেন্ট, বিতর্কিত হোক কী না হোক
ঋতুপর্ণর আরেকটি অবদান ছিল মিডিয়ার চর্চায় 'কনটেন্ট'-এর আমদানি করা। তাঁর টক শো লোকের শুনতে ভালোবাসত কারণ তিনি ছিলেন জ্ঞানী ও মেধাবী এবং চিন্তাবিদ। তাঁর গভীরতার একটি পরিচায়ক ছিল তাঁর চোখদুটি যা অপর্ণা সেনও স্বীকার করেছেন পরে। নিজের নারীসুলভ আচার আচরণের জন্যে ঋতুপর্ণ বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত ছিলেন না; উল্টে কেউ তা নিয়ে হাসাহাসি করলে সাবধান করে দিতেন যে সেই তাচ্ছিল্যের মধ্যে দিয়ে তাঁকে নয়, ছোট করা হচ্ছে একটা গোটা সম্প্রদায়কে। নিজেকে সেই সামাজিকভাবে কোনঠাসা করে রাখা সম্প্রদায়ের রোল মডেল করে খুব গর্বিত বোধ করতেন ঋতুপর্ণ। প্রকৃত শিক্ষিত ও সহমর্মী মানুষেরা ওরকমই হন।












Click it and Unblock the Notifications