সত্যজিৎ-এর কয়েকটি শিশুকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র, যা আজও প্রাসঙ্গিক
শিশু-সাহিত্যই হোক কিংবা শিশু- চলচ্চিত্র, শিশুদের মন বুঝে তাদের মনগ্রাহী গল্প উপহার দেওয়া নেহাত সহজ কাজ নয়। চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবে সেই কাজ সাফল্যের সঙ্গে করেছেন সত্যজিৎ।
ফেলুদা , জটায়ু, তোপসে, মুকুল কিংবা গুপি গাইন, বাঘা বাইন, বা 'হীরক রাজার দেশের' মাস্টারমশাই, সত্যজিৎ-এর ছবির এই সমস্ত চরিত্র আজও ছোট-বড় সব বাঙালিরই খুব কাছের। শিশু-সাহিত্যই হোক কিংবা শিশু- চলচ্চিত্র, শিশুদের মন বুঝে তাদের মনগ্রাহী গল্প উপহার দেওয়া নেহাত সহজ কাজ নয়। চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবে সেই কাজ সাফল্যের সঙ্গে করেছেন সত্যজিৎ। তাঁর সেই সমস্ত সৃষ্টি দিয়ে আজও তিনি রয়েছেন বাঙালির মননে।
সত্যজিৎ -এর শিশু কেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের গল্পে, জীবনের বিভিন্ন বয়সে বাঙালি খুঁজে পেয়েছে কাহিনীর নতুন নতুন 'মানে'। তা সে 'হীরক রাজার দেশে'-ই হোক বা 'পরশ পাথর' -ই হোক। শিশুর সারল্য নিয়ে দেখা যেছবির গল্প অনেকটা সহজ মনে হয়েছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ছবিই ছুঁয়ে গিয়েছে বাঙালির সমাজবোধ কিংবা রাজনৈতিকবোধকে। আর সেজন্যই এই সমস্ত ছবি কালজয়ী। এই সমস্ত ছবি বাঙালির গর্বের 'পাওনা'। একবার ফের মনে করে নেওয়া যাক, সত্যজিৎ নির্মিত শিশু কেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি ছবিতে।

সোনার কেল্লা
রাজস্থানের প্রেক্ষাপটে নির্মিত 'সোনার কেল্লা' মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। ছবির কাহিনী, এক জাতিস্মর শিশুর অপহরণকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। ছবিটি 'ফেলুদা' সিরিজের অন্যতম বিখ্যাত ছবি। ছবিতে সেই শিশুকে উদ্ধার করতেই আগমন গোয়েন্দা প্রদোষ মিত্রের ওরফে 'ফেলুদা'। ফেলুদার সঙ্গে রয়েছেন তাঁর সহকারী তথা ভাই 'তোপসে', আর রয়েছেন লেখক জটায়ু। অভিনয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষ দত্ত, সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় মন কেড়ে ছিলেন সবার।ছবির প্রতিটি চরিত্র এমনকি সংলাপ আজও জনপ্রিয়।

জয়বাবা ফেলুনাথ
জানা যায় , আর্থার কোনান ডয়েলের সৃষ্টি করা বিখ্যাত গোয়ন্দা চরিত্র শার্লক হোমস থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সত্যজিৎ বানিয়েছিলেন গোয়েন্দা চরিত্র 'ফেলুদা'। বাঙালি এই গোয়েন্দার নানা কাহিনীর লেখক সত্যজিৎ রায়। তবে ফেলুদা সিরিজের মাত্র ২ টি ছবিতেই তিনি পরিচালনার কাজ করেন। 'সোনার কেল্লার' পর ' জয় বাবা ফেলুনাথ ' ছবির পরিচালনা করেন তিনি। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৯-এ।এই ছবির প্রেক্ষাপট বারাণসী। সেখানে এক মূর্তিকে ঘিরে যাবতীয় রহস্য উদ্ঘাটন করে ফেলুদা। ছবিতে অভিনয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষ দত্ত, সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় ছাড়াও নেগেটিভ চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ে তাক লাগিয়ে দেন উৎপল দত্ত। তাঁর চরিত্র মগনলাল মেঘরাজকে আজও বাংলা ছবিতে অন্যতম সেরা "ভিলেন' চরিত্র বলে মনে করা হয়।

পরশ পাথর
ছোটদের জন্য তৈরি করা সত্যজিৎ রায়ের অপর মনকাড়া ছবি 'পরশ পাথর' মুক্তি পায় ১৯৫৮ সালে ।এই ছবির মধ্যে নীতি শিক্ষা যতটা রয়েছে ততটাই ঠাসা রয়েছে গভীর সমাজবোধ। সাদাকালো ফ্রেমে, স্বর্ণযুগের অভিনেতা তুলসী চক্রবর্তীর কালজয়ী অভিনয় আজও বাঙালীর অন্যতম সেরা পাওনা।

হীরক রাজার দেশে
১৯৮০ সালে মুক্তি পায় পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের 'হীরক রাজার দেশে' । ছবিতে ছন্দ মিলিয়ে মজার সংলাপের আড়ালে এক সুচতুর বার্তা দিয়েছেন পরিচালক সত্যজিৎ। এটি 'গুপি গাইন বাঘা বাইন সিরিজের' অন্যতম ছবি। ছবিতে অভিনয়ের দিকে থেকে তপেন চট্টোপাধ্যায় , রবি ঘোষ জুটির পাশপাশি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং উৎপল দত্ত ও ছিলেন অসামান্য। গোটা ছবি জুড়ে এক নিপুণ সমাজভাবনা উপহার দিয়েছেন এই অস্কারজয়ী পরিচালক।

গুপী গাইন বাঘা বাইন
সাহিত্যিক তথা সত্যজিৎ রায়ের দাদু উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরি সৃষ্টি করেছিলেন দুটি কালজয়ী চরিত্র, গুপী গাইন ও বাঘা বাইন। সেই দুই চরিত্রকে নিয়েই ১৯৬৯ সালের ছবি 'গুপী গাইন বাঘা বায়েন'। গ্রাম বাংলার প্রেক্ষাপটে সাজানো এই ছবি জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতকে পেরিয়ে যুদ্ধে জেতার গল্প তুলে ধরা হয়েছে। গোটা ছবিটি সাদা -কালো হলেও শেষে এক বিশেষ মুহুর্তে ছবিটিতে 'রঙ'দিয়ে তাকে 'কালার ফিল্মে' রূপান্তরিত করা হয়েছে। যা পরিচালকের মুন্সিয়ানা নিয়ে প্রশংসার দাবি রাখে। ছবিতে তপেন চট্টোপাধ্যায় , রবি ঘোষের পাশপাশি সন্তোষ দত্ত ও জহর রায়ের অভিনয় ছিল অনবদ্য।












Click it and Unblock the Notifications