গ্রামীণ বাংলায় নীরবে বাড়ছে সিপিএম! তৃণমূলে দুর্নীতিতে বাম-উত্থানে চাপে পদ্মশিবিরও
গ্রামীণ বাংলায় নীরবে বাড়ছে সিপিএম! তৃণমূলে দুর্নীতিতে বাম-উত্থানে চাপে পদ্মশিবিরও
তৃণমূলের জমানায় ৩৪ বছরের শাসকের ঘুম উড়েছিল। মাত্র ১০ বছরেই প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে শূন্য পৌঁছে গিয়েছিল সিপিএম। কিন্তু দেওয়ালে পিঠ থেকে যাওয়ার পরই ঘুরে দাঁড়ানোর কাজ শুরু করে তাঁরা। একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে ফিরে আসার যুদ্ধে নেমেছে বামেরা। মাত্র এক বছরেই হারানো জমি পুনরুদ্ধারে তাঁরা প্রভূত সাফল্য পেতে শুরু করেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।

একুশের যুদ্ধে তৃণমূলের প্রধান চ্যালেঞ্জার হয়ে উঠেছিল বিজেপি। কিন্তু বিজেপিকে ধরাশায়ী করে তৃণমূল তৃতীয় নেয়াদে ক্ষমতা দখল করে। আর তারপর থেকেই বিজেপি পিছু হটতে শুরু করে বাংলায়। সম্প্রতি তৃণমূল নিয়োগ দুর্নীতিতে ব্যাকফুটে চলে যাওয়ার পর হারানো জমি পুনরুদ্ধারে ব্রতী হয় বাম ও বিজেপি উভয়েই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এই অলিখিত লড়াইয়ে বিজেপির থেকে অনেকটাই এগিয়ে বামেরা।
প্রচারবিমুখ থেকেই গ্রামবাংলায় নীরবে বেড়ে চলেছে সিপিএম তথা বামেরা। লালঝান্ডার মিছিলে লোক বাড়ছে। ক্রমেই বিজেপিকে সরিয়ে বামেরা চেষ্টা করছে তৃণমূল কংগ্রেসের চ্যালেঞ্জার হয়ে উঠতে। বামেরা এ অভিযোগ করতেই পারে যে, বিজেপি যে প্রচার পাচ্ছে তার সিকিভাগও তারা পায় না। কিন্ত হালে একটা জিনিস লক্ষ্যণীয় যে বামপন্থীদের সমাবেশে জনসমাগম হচ্ছে।

আর বামপন্থীরা যখন নীরবে বাড়ছে, তখন বিজেপি গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ। বঙ্গ বিজেপি এখন নানা ভাগে বিভক্ত বলে অভিযোগ করেন বিরোধীরা। সুকান্ত বিজেপি, শুভেন্দু বিজেপি, দিলীপ বিজেপি, লকেট বিজেপি- এমন নানা গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে বিজেপি তৃণমূলের দুর্বলতার ফায়দা তুলতে পারছে না। বরং বামেরা এই সুযোগে বাড়তে শুরু করেছে। তারা বোঝাতে সমর্থ হচ্ছে যে বিজেপি নয়, তৃণমূলের একমাত্র বিকল্প সিপিএম বা বামেরাই।
কারণ হিসেবে বামেরা মানুষকে বোঝাতে সমর্থ হয়েছে যে, তৃণমূল বা বিজেপি এক। তৃণমূল ছেড়ে নেতারা বিজেপিতে আশ্রয় নেয় আবার বিজেপিতে কোন্দল হলে তৃণমূলে। একুশের নির্বাচনে বিজেপি যে তৃণমূলের সেকেন্ড টিমে পরিণত হয়েছিল তা মানুষ দেখেছে। তৃণমূলের বিক্ষুব্ধরাই ভিড় জমিয়েছিলেন তৃণমূলে। ফলে তৃণমূলের বাতিলদের দিয়ে যে পরিবর্তন সম্ভব নয় তা স্পষ্ট হয়ে যায় বাংলার মানুষের কাছে।

বামেরা যেভাবে বাড়ছে, তা চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে বিজেপির, আবার তা চিন্তার কারণ তৃণমূলেরও। অনুব্রতহীন বীরভূম জেলায় বামপন্থীরা বাড়ছে, বাড়ছে কলকাতা লাগোয়া হাওড়া জেলাতেও। সিপিএম বাড়ছে মুর্শিদাবাদ, এমনকী শুভেন্দু অধিকারীর জেলা পূর্ব মেদিনীপুরেও। শিলিগুড়ি-সহ উত্তরবঙ্গের অনেক জেলাতেও সিপিএম আবার মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিজেপি যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে খুল্লামখুল্লা আক্রমণ করছে, বামেরা সেই পথে না হেঁটে মেপে মেপে আক্রমণ করছে। তাছাড়া সিপিএম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে। আর তার ফলও পেতে শুরু করেছে।
সিপিএম বুঝতে পেরেছে শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতা করলেই হবে না। গ্রামেগঞ্জে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। জনসংযোগ বাড়াতে হবে। মানুষের মনে তাঁদের উপস্থিতি বাড়াতে হবে। তবেই মানুষ আবার বিশ্বাস করতে শুরু করবে সিপিএমকে। সম্প্রতি নন্দকুমারে সমবায় সমিতি নির্বাচনে যে সাফল্য এসেছে, তার নেপথ্যে রয়েছে বামপন্থীদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।
সিপিএমের কথায়, তাঁদের জয়কে তৃণমূল নানাভাবে অপব্যাখ্যা করছে। কিন্তু আসল কথা হল তৃণমূল গ্রামবাংলায় জনবিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছে। এর কারণ তৃণমূল পঞ্চায়েত স্তরে যেসব নেতাকে লালন করছে, তারা সবাই কিছু না কিছু দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। ফলে তৃণমূল সাধারণ মানুষের চোখে ছোটো হয়ে যাচ্ছে। আর এর ফলে যে শূন্যস্থান তৈরি হচ্ছে সেখানে ঢুকে পড়ছে সিপিএম।

সিপিএম সম্প্রতি যে কর্মসূচি শুরু করেছে, তার ফল পেতে শুরু করেছে। সিপিএম কর্মসূচি নিয়েছে-'গ্রাম বাংলায় ঘরে ঘরে, লাল ঝান্ডা নভেম্বরে'। এই মর্মে জেলায় জেলায় মিছিল হচ্ছে। 'নজরে পঞ্চায়েত' কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় শাসক নেতাদের দুর্নীতিও প্রকাশ করার পরিকল্পনা নিয়েছে সিপিএম। তারপর 'চোর ধরো জেলে ভরো' কর্মসূচিতে ব্যাপক সাড়া মিলেছে।
বিজেপি আন্দোলনের তীব্রতাকে এই পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেনি। তারা বিক্ষিপ্ত আন্দোলন করেছে। বেশিরভাগটাই সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর। কিন্তু সিপিএম মাঠে-ময়দানে নেমে তৃণমূলের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে একটা মাত্রায় পৌঁছে দিতে পেরেছে। তারই ফলে বাড়ছে সিপিএম। লাল ঝান্ডার আনাগোনা ফের শুরু হয়েছে বাংলায়।












Click it and Unblock the Notifications