অস্বস্তিতে শুভেন্দু! দলবদলের হিড়িকে উল্টো স্রোত বইয়ে দিলেন যেসব নেতারা
একুশের নির্বাচনের আগে তৃণমূল ছেড়ে একের পর এক ডাকসাইটে নেতা বিজেপিতে ভিড়েছিলেন। শুভেন্দু অধিকারীকে দিয়ে তৃণমূলে ভাঙনের যে স্রোত বইতে শুরু করেছিল বিজেপির পালে, তা ভোটের পর উল্টোদিকে বইতে শুরু করেছে।
একুশের নির্বাচনের আগে তৃণমূল ছেড়ে একের পর এক ডাকসাইটে নেতা বিজেপিতে ভিড়েছিলেন। শুভেন্দু অধিকারীকে দিয়ে তৃণমূলে ভাঙনের যে স্রোত বইতে শুরু করেছিল বিজেপির পালে, তা ভোটের পর উল্টোদিকে বইতে শুরু করেছে। এবার বিজেপি ভাঙছে আর যোগদানের হিড়িক পড়েছে তৃণমূলে। সেই দলবদলের খেলায় প্রতিনিয়ত অস্বস্তি বাড়ছে শুভেন্দু অধিকারীর।

উল্টো স্রোত বইতে শুরু করেছে মমতার জয়ের পর
শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলের কোমর ভেঙে প্রায় শতাধিক নেতাকে নিয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। মেদিনীপুরের সভায় অমিত শাহের হাত থেকে পতাকা নেওয়ার সেই অনুষ্ঠানে তৃণমূলের বিদায়ঘণ্টা বাজানোর যে শপথ নিয়েছিলেন তিনি, তা সফল হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে আরও বিপুল ক্ষমতা নিয়ে সরকার গড়েছেন। তারপরই উল্টো স্রোত বইতে শুরু করেছে বাংলায়।

মুকুল-ঘনিষ্ঠরা দল ছাড়া শুরু করেন ভোটের পরই
বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী পর্বে মুকুল রায়কে দিয়ে শুরু হয়েছে বিজেপির ভাঙন পর্ব। তারপর শুভেন্দুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে যাঁরা তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গিয়েছিলেন, তাঁদের মোহভঙ্গ হতে শুরু করে। আর বিজেপি ছাড়ার হিড়িক পড়ে যায়। প্রথমে মুকুল-ঘনিষ্ঠরা দল ছাড়া শুরু করলেও শুভেন্দু অস্বস্তিও ধরা পড়ে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগদানের হিড়িকে।

শুভেন্দুর অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছেন অনেকে
এই হিড়িকে বিষ্ণুপুরের বিধায়ক তন্ময় ঘোষ যদি প্রথম জন হন, তবে শুভেন্দুর অস্বস্তি বাড়ানোর তালিকায় রয়েছেন সুনীল মণ্ডল, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়, হাওড়া জেলা সদরের বিজেপি সভাপতি সুরজিৎ সাহা, হাওড়া সদর বিজেপির জেল সম্পাদক বিমল প্রসাদ এবং উত্তরপাড়ার প্রাক্তন বিধায়ক সাংবাদিক প্রবীর ঘোষালও। আরও অনেক নাম রয়েছে, যাঁরা শুভেন্দু অধিকারীর অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছেন।

শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর
শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর প্রথম সাংসদ সুনীল মণ্ডলের বাড়িতে বৈঠক করেছিলেন। সেই বৈঠকে তৃণমূলের অনেক বড় বড় নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সবাইকে নিয়ে তিনি বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রায় শতাধিক নেতাকে নিয়ে তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন মেদিনীপুরের সভায়। তারপর তৃণমূলে সেই ভাঙন দেখা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবীর ঘোষাল-সহ আরও কয়েকজন নেতা চ্যাটার্ড ফ্লাইটে করে দিল্লি উড়ে গিয়ে যোগ দিয়েছিলেন বিজেপিতে।

বিজেপি গোহারা হারতেই সাজানো বাগান ওলট-পালট
কিন্তু নির্বাচনে বিজেপি গোহারা হারতেই সাজানো বাগান ওলট-পালট হয়ে যায়। মুকুল-শুভ্রাংশুর ঘরওয়াপসির পর শুভেন্দুর শিবির ছেড়ে বিষ্ণুপুরের বিধায়ক তন্ময় ঘোষ যোগ দেন তৃণমূলে। সুনীল মণ্ডল তো তৃণমূল জয়ে ফেরার পর থেকেই পুরনো দলে যোগ দিতে তৎপর হয়ে ওঠেন। শুভেন্দুর বিরুদ্ধে য়োগাযোগ না রাখরা অভিযোগ, তাঁকে পদ পাইয়ে দেওয়ার নানা অভিযোগ করতেও পিছপা হননি।

শুভেন্দু-রাজীবকে নিয়ে তৃণমূল-রাজের অবসান চেয়েছিল বিজেপি
তারপর রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর পর বিজেপিতে যাওয়া তৃণমূল নেতাদের মধ্যে অন্যতম বড় নাম। বিজেপি চেয়েছিল শুভেন্দু-রাজীবকে দিয়ে তৃণমূল-রাজের অবসান ঘটাতে। তা না হওয়ায় রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটের পরই ভুল বুঝতে পারেন। তিনি তৃণমূলে ফিরতে চান। কিন্তু তৃণমূলে ফেরার পথ তাঁর কাছে কণ্টকময় হয়ে ওঠে হাওড়ার অন্দরের সমীকরণে। এবং কর্মীদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়। তা সত্ত্বেও তিনি তৃণমূলে ফেরেন ত্রিপুরায় গিয়ে। ফলে শুভেন্দু তাঁর সঙ্গে তৃণমূল ছেড়ে আসা নেতাদের সঙ্গে রাখতে ব্যর্থ হন।

শুভেন্দুর বিরুদ্ধে মুখ খোলায় বিজেপি সভাপতিকে বহিষ্কার
আর হালে হাওড়া সদর জেলা বিজেপির সভপাতি সুরজিৎ সাহা শুভেন্দুর বিরুদ্ধে তোপ দেগে অভিযোগ করেন, বিজেপকে শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলের বি টিম বানিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মন্তব্যে সামনে চলে আসে বিজেপির আদি-নব্য দ্বন্দ্ব। চরম অস্বস্তিতে পড়ে যায় বিজেপি নেতৃত্ব। শুভেন্দুর বিরুদ্ধে মুখ খোলায় জেলা সদরের বিজেপি সভাপতিকে বহিষ্কার করা হয় দল থেকে।

শুভেন্দু অধিকারীর অস্বস্তি বাড়িয়ে দেন বিজেপি নেতা
এবার বিজেপির প্রাক্তন জেলা সভাপতিকে সমর্থন করেন জেলা সাধারণ সম্পাদক বিমল প্রসাদ। তিনি সুরজিৎ সাহার বক্তব্যকে সমর্থন করে শুভেন্দু অধিকারীর অস্বস্তি বাড়িয়ে দেন। এরপর তিনি পদত্যাগএ করেন। পদত্যাগী নেতার মন্তব্য জেলা বিজেপির আহ্বায়ক মণিমোহন ভট্টাচার্য উড়িয়ে দিলেও অস্বস্তি পুরোপুরি এড়াতে পারেননি কেউই। শুধু পদত্যাগী নেতাদের বক্তব্য উড়িয়ে দিয়েই তাঁরা ক্ষান্ত।

বিজেপি নেতার তৃণমূলের মুখপত্রে প্রতিবেদন
এরপর প্রাক্তন বিধায়ক-সাংবাদিক বিজেপি নেতা প্রবীর ঘোষাল তৃণমূলের মুখপত্রে একটি প্রতিবেদনে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, মানসিকভাবে বিজেপির সঙ্গে নেই। বিজেপিতে কাজ করা যায় না। বিজেপিও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেনি, আমিও বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখি না। নির্বাচনের মধ্যেই দুবার বিজেপি ছাড়তে চেয়েছিলাম।

শুভেন্দু অধিকারীর প্রসঙ্গ টেনে অস্বস্তি বাড়ালেন নেতা
তিনি আরও লেখেন, শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরেই বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। বিজেপিতে কাজ করার লোকের থেকে টাকা চাওয়ার লোক বেশি। তিনি বলেন, বিজেপিতে মানসিকভাবে নেই। তবে তৃণমূলে যাচ্ছে না এখনই। আপাতত লেখালেখি নিয়েই থাকতে চাই। তিনি এদিন শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপিতে থাকা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই দলে কাজ করার লোকেরা থাকতে পারে না। শুভেন্দু অধিকারীও থাকতে পারবেন কি না, সংশয়। শুভেন্দু অধিকারীর প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি অস্বস্তি বাড়িয়ে দেন বিজেপির।

বিজেপিতে শুভেন্দু অধিকারীর অস্বস্তি বিভিন্ন দিকে!
উল্লেখ্য, শুভেন্দু গড়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি গিয়েছিলেন, সেই অনুষ্ঠানে গরহাজির ছিলেন নন্দীগ্রামে সূর্যোদয়ের নায়ক। তারপর শুভেন্দুর উপস্থিতিতে পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি সাংগঠনিক জেলার অনুষ্ঠানে বিজেপির চার বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন না, তা নিয়েও নানা জল্পনার বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল। ফলে বিজেপিতে শুভেন্দু অধিকারীর অস্বস্তি বিভিন্ন দিকে থেকে বাড়ছে। যদিও শুভেন্দু এসব তোয়াক্কা না করে তিনি বিরোধী দলনেতা হিসেবে তাঁর ভূমিকা পালন করে চলেছেন সক্রিয়ভাবে।












Click it and Unblock the Notifications