৩০ মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীর জল সংরক্ষিত ছিল যেখানে, গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য
৩০ মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীর জল সংরক্ষিত ছিল যেখানে, গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য
বিশ্বে জলের উৎপত্তি কোথা থেকে, তা নিয়ে উত্তর খোঁজার শেষ নেই। নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। প্লেট টেকটোনিক্স, জলবায়ু, সর্বোপরি জীবনধারণের জন্য জল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর মতো অন্যান্য গ্রহও বাসযোগ্যতার প্রামাণ্য হিসেবে জলের উৎস খোঁজা হয়। জল না থাকলে জীবন থাকবে না। সেই জল নিয়ে গবেষণায় উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য।

একটি রাসায়নিক যৌগে জল গবেষণা
রাশিয়ার স্কোলকোভো ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকরা জলের উৎস অনুসন্ধান করেছেন। স্কোলটেকের একজন অধ্যাপক এবং তাঁর চিনা সহকর্মীদের দ্বারা পরিচালিত এক গবেষণা রিপোর্ট সম্প্রতি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস নামক গবেষণাপত্রে বলা হয়ছে, কীভাবে জল একটি রাসায়নিক যৌগ থেকে উদ্ভূত হতে পারে।

রাসায়নিক যৌগে ভূগর্ভস্থ জল সংরক্ষণ
ওই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, একটি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া রাসায়নিক যৌগ কীভাবে ভূগর্ভস্থ জল সংরক্ষণ করে রাখতে পারে। একটা সময় পৃথিবী যখন খুব উষ্ণ ছিল, তখন পৃথিবী পৃষ্ঠের জল বাষ্পীভূত হয়ে যায়। ভূ-পৃষ্ঠের জল শুধুমাত্র জীবনের উৎপত্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদার্থ নয়, দীর্ঘ সময় ধরে একটি গ্রহের জলবায়ু স্থিতিশীল করার জন্যও অপরিহার্য। এটিই বিবর্তন ঘটতে দিয়েছে।

পৃথিবীতে জলের উৎপত্তি কোথায়?
প্লেট টেকটোনিক্স হল এমন একটি প্রক্রিয়া যা মহাদেশ এবং মহাসাগরকে আকার দেয় এবং ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরিকে চালিত করে। পৃথিবীর মতো পাথুরে গ্রহের বিবর্তনের জন্য জলের বিশাল গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও, বিজ্ঞানীরা এখনও জানেন না যে পৃথিবীতে জলের উৎপত্তি কোথায়। তা নিয়েই নিরন্তর গবেষণা চলছে।

কেন ধূমকেতু পৃথিবীয়ে জলের উৎস নয়
গবেষণার সহ-লেখক স্কোলটেকের অধ্যাপক আর্টেম আর. ওগানভ জানিয়েছিলেন, কিছু বিজ্ঞানী মনে করেছিলেন যে পৃথিবীতে জল ধূমকেতু থেকে এসেছে। তবে সেই উৎসটি খুব সীমিত। এর কারণ হল ধূমকেতুতে জলের আইসোটোপ গঠন পৃথিবীর তুলনায় বেশ আলাদা। অতএব, বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে জল যদি উপর থেকে না আসে তবে তা অবশ্যই নীচে থেকে এসেছে।

পৃথিবী প্রথম ৩০ মিলিয়ন বছর খুব উত্তপ্ত ছিল।
পৃথিবীর গভীর এমন কোনও পদার্থ রয়েছে, যেখানে জল সংরক্ষিত থাকতে পারে। ধরে নেওয়া হয়েছিল পৃথিবীর মূল অংশ থেকে এসেছে জল। পৃথিবী সৃষ্টির ইতিহাসে প্রথম ৩০ মিলিয়ন বছর খুব উত্তপ্ত ছিল। কারণ গ্রহটি গ্রহাণু দ্বারা অবিরাম সংঘর্ষের মধ্যে ছিল। মঙ্গল গ্রহের আকারের একটি গ্রহের সঙ্গেও সংঘর্ষ হয়েছিল বলে মনে করেন ভূ-বিজ্ঞানীরা।

জল কীভাবে প্রথম ৩০ মিলিয়ন বছর অবশিষ্ট ছিল
যদি ধরেই নেওয়া হয়, পৃথিবীতে জল ছিল প্রথম থেকেই। এই অবস্থায় একটি প্রশ্ন উঠছে, উত্তপ্ত গ্রহে জল কীভাবে প্রথম ৩০ মিলিয়ন বছর অবশিষ্ট ছিল। পৃথিবীর কিছু অংশে জল অবশ্যি বাষ্পীভূত হয়েছে। যা অবশিষ্ট ছিল তা কমপক্ষে সাতশো কিলোমিটার নীচে অপসৃত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত একটি স্থিতিশীল যৌগ আবিষ্কার করতে পারেননি, যা হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন পরমাণুগুলিকে ধরে রাখতে পারে।

একটি যৌগ আবিষ্কার হয়েছে যেখানে জল সংরক্ষিত
জল হাইড্রোজেনের দুটি পরমাণু এবং অক্সিজেনের একটি পরমাণু দিয়ে তৈরি। ওগানভ এবং চিনের নানকাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিয়াও ডং-এর নেতৃত্বে একদল গবেষক অর্গানভের স্ফটিক কাঠামোর ভবিষ্যদ্বাণী পদ্ধতি ইউএসপিএক্স ব্যবহার করে এমন একটি যৌগ আবিষ্কার করেছেন, যা গ্রহের অভ্যন্তরে হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন পরমাণুগুলিকে আটকে রাখতে পারে।

কোন উপাদান জল সংরক্ষণ করেছিল
বিজ্ঞানীরা ম্যাগনেসিয়াম হাইড্রোসিলিকেট নামক একটি যৌগ আবিষ্কার করেছেন। যার সূত্র হল Mg2SiO5H2, যা ওজন অনুসারে ১১ শতাংশের বেশি জল। গবেষণায় এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এটি দুই মিলিয়নেরও বেশি বায়ুমণ্ডলের চাপে এবং অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় স্থিতিশীল। উল্লেখ্য, পৃথিবীর মূল অংশে দুই মিলিয়নেরও বেশি বায়ুমণ্ডলের চাপ রয়েছে।

লোহা তৈরি হতে প্রায় ৩০ মিলিয়ন বছর সময় নেয়
সবাই জানে ওই কোরটি একটি ধাতব বল এবং এতে বেশিরভাগ লোহা রয়েছে। ওগানভ ব্যাখ্যা করেন, এটি ভুল। কারণ, সেই সময়ে কোনও কোর ছিল না। তিনি বলেছিলেন যে পৃথিবীর অস্তিত্বের প্রারম্ভে, গ্রহটি অস্থির ছিল। গ্রহটিতে লোহা তৈরি হতে প্রায় ৩০ মিলিয়ন বছর সময় নেয়। লোহা সিলিকেটগুলিকে উপরে ঠেলে দেয় যাকে আমরা এখন ম্যান্টেল বলি।

পৃথিবীতে সেই সময়ে গ্রহাণু-বর্ষণ চলছিল
৩০ মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীর জলের কিছু অংশ নিরাপদে হাইড্রোসিলিকেট আকারে বর্তমান দিনের মূলের গভীরতায় সংরক্ষণ করা হয়েছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। পৃথিবীতে সেই সময়ে গ্রহাণু-বর্ষণ চলছিল। কোর তৈরি হওয়ার সময় হাইড্রোসিলিকেটগুলি নিম্নচাপের এলাকায় ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।

পৃথিবীতে জল নিরাপদ জায়গায় রয়েছে
নিম্নচাপ অঞ্চলে হাইড্রোসিলিকেটগুলি অস্থির হয়ে ওঠে এবং পচন ধরে যায়। এই প্রক্রিয়াটি ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড এবং ম্যাগনেসিয়াম সিলিকেট তৈরির দিকে পরিচালিত করে, যা আজ জলের সঙ্গে ম্যান্টেল তৈরি করে। পৃথিবীর পৃষ্ঠে ১০০ মিলিয়ন বছরের দীর্ঘ যাত্রা শুরু হয় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। ওগানভ বলেছিলেন, পৃথিবীতে জল নিরাপদ জায়গায় রয়েছে, কারণ এটি এখনও ভূপৃষ্ঠে প্রবেশ করেনি।

কীভাবে মহাকাশীয় বস্তুতে জলের প্রভাব
জলের উৎপত্তির নতুন অনুমান অন্যান্য মহাকাশীয় বস্তুতেও জলের উপস্থিতি ব্যাখ্যা করতে পারে। ওগানভ বলেন, উদাহরণস্বরূপ মঙ্গলের কথাই ধরা যাক। ম্যাগনেসিয়াম হাইড্রোসিলিকেটকে স্থিতিশীল করার জন্য প্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করার অবস্থা নেই। এর ফলে লাল গ্রহটি শুষ্ক এবং এত শুষ্ক যে, মঙ্গলে যদি জল থেকেও থাকে, তার উৎস ধূমকেতু।

সৌরজগতের বাইরের গ্রহ
লেখক সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলিকেও বিবেচনা করেছেন। জিয়াও ডং বলেন, একটি এক্সোপ্ল্যানেটের বাসযোগ্য হওয়ার জন্য একটি স্থিতিশীল জলবায়ু থাকতে হবে এবং এর জন্য মহাদেশ এবং মহাসাগর উভয়ই প্রয়োজন। সুতরাং, জল থাকতে হবে, তবে খুব বেশি নয়। পৃথিবীর মতো যে কোনও আকারের গ্রহ বাসযোগ্য হতে হলে, ওজনে ০.২ শতাংশের বেশি জল থাকা উচিত নয়।

সুপার-আর্থের জন্য ব্যাখ্যাটি সম্ভবত ভিন্ন
জিয়াও ডং ব্যাখ্যা করেছেন, 'সুপার-আর্থস' নামে পরিচিত বৃহৎ পৃথিবীর গ্রহগুলির জন্য ব্যাখ্যাটি সম্ভবত ভিন্ন। এর কারণ হল এই ধরনের গ্রহগুলিতে, ম্যাগনেসিয়াম হাইড্রোসিলিকেটকে স্থিতিশীল করার চাপগুলি কেন্দ্রের বাইরেও থাকতে হবে। প্রচুর পরিমাণে জল অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখতে হবে। এর ফলে সুপার-আর্থে অনেক বেশি পরিমাণ জল থাকতে পারে।












Click it and Unblock the Notifications