মমতার মন্ত্রিসভার শপথে রাজভবনে ছিলেন শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়! 'প্রভাবশালী' তকমায় যোগ নয়া মাত্রা
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার তৃতীয়বার গঠিত হওয়ার পর গত ৩ অগাস্ট মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ হয়েছিল। একাধিক মন্ত্রী শপথ নিয়েছিলেন। সেই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নিয়োগ দুর্নীতিতে ইডি-র হাতে গ্রেফতার হওয়া শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়। কার সঙ্গে তিনি গিয়েছিলেন রাজভবনে তা নিয়ে জোরালো জল্পনা শুরু হয়েছে।

সোনার খনি!
শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় আপাতত ২৪ মার্চ অবধি থাকবেন ইডি হেফাজতে। নিয়োগ দুর্নীতিতে শান্তনুর যুক্ত থাকার সপক্ষে একাধিক প্রমাণ মিলেছে বলে আদালতে দাবি করেছে ইডি। আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন সম্পত্তি মিলেছে বলেও জানা যাচ্ছে। শান্তনুকে জেরা করে দুর্নীতিতে যুক্ত মাথাদের খোঁজ চালাচ্ছেন ইডি তদন্তকারী অফিসাররা। শান্তনুর দুটি মোবাইলকে সোনার খনি বলে উল্লেখ করেছেন তাঁরা।

কুন্তল মাস্টারমাইন্ড?
শান্তনু অবশ্য গতকালও দাবি করেছেন, তিনি নির্দোষ। তাঁর ফোনেই আসল সত্য বেরিয়ে আসবে। কুন্তলই এই দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড। কারও নির্দেশ ছিল না টাকা তোলার জন্য। নিজের স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা বন্দ্যোপাধ্যায় এ সবে যুক্ত নয় বলেও জানান শান্তনু। নিজের সম্পত্তিকে বৈধ বলেও দাবি হুগলি জেলা পরিষদের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ কর্মাধ্যক্ষর। কুন্তল নানাভাবে সকলকে বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি ভিনরাজ্যে টাকা সরাচ্ছেন বলেও অভিযোগ।

স্বপদে বহাল
কুন্তল ঘোষকে এখনও তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল রাখা হয়েছে। শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও দলীয় কোনও পদে না থাকলেও সরকারি পদে রয়েছেন। হুগলি জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষের বিরুদ্ধেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অথচ পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে সরিয়ে দিতে দেরি করেনি তৃণমূল কংগ্রেস। স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠছে, কেন শান্তনু বা কুন্তলের বিরুদ্ধে দল ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

সরব হয়েছে তৃণমূলের ব্লক নেতৃত্ব
শান্তনুর গ্রেফতারির পর সিপিআইএম, বিজেপি মিছিল করেছে বলাগড়ে। এমনকী মুখ খুলেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের ব্লক সভাপতি ও অন্যান্য নেতারা। শান্তনুর বিপুল সম্পত্তি বৃদ্ধি দলকে অস্বস্তি ফেলছিল বলে দাবি তাঁদের। শান্তনু গত পঞ্চায়েত ভোটে সন্ত্রাস চালান বলেও তৃণমূল কংগ্রেসের ব্লক নেতৃত্ব দাবি করছে। দুর্নীতিতে শান্তনু গ্রেফতার হওয়ায় দল ভালো ফল করবে বলেও নিশ্চিত সেই নেতারা।

দূরত্ব বাড়ানোর বার্তা
তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র তথা রাজ্যের পরিবহনমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী একটি সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, পার্থ চট্টোপাধ্যায় দলে যে জায়গায় ছিলেন সেখান থেকে তাঁকে সরিয়ে বার্তা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শান্তনুর মতো যাঁরা পদে রয়েছেন তাঁদের জন্য এমন বার্তা দেওয়ার দরকার আছে বলে দল এখনও মনে করছে না। দলে গণতান্ত্রিক কাঠামো থাকায় যে কেউ কোনও অন্যায় দেখে মুখ খুলতে পারেন বলে ব্লক নেতৃত্বের পাশে থাকার বার্তা দেন স্নেহাশিস।

ব্লক নেতৃত্বের পাশে মুখপাত্র
স্নেহাশিসের কথায়, শান্তনুর মতো হাজার হাজার জনপ্রতিনিধি দলে রয়েছেন। তাঁদের কেউ কোথাও দলের নির্দেশ না থাকা সত্ত্বেও অন্যায় করলে স্থানীয় নেতৃত্ব সরব হতেই পারেন। শান্তনুর ক্ষেত্রে আদালতের রায় গ্রহণ করা হবে বলেও জানান স্নেহাশিস। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন, শান্তনুর গ্রেফতারির পরেই কেন দল দূরত্ব বাড়াচ্ছে?

উঠছে একাধিক প্রশ্ন
শান্তনুর সঙ্গে দলের শীর্ষস্তরের ঘনিষ্ঠতার কথা জানেন দলের অনেকেই। সেই কারণে অনেকে মুখ খোলার সাহস পেতেন না বলেও জানিয়েছেন তৃণমূলেরই একাংশ নেতা-কর্মী। শান্তনুর সঙ্গে স্নেহাশিস চক্রবর্তীর ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কেও অনেকেই ওয়াকিবহাল। এখানেই প্রশ্ন, এখন যাঁরা মুখ খুলছেন তাঁরা আগে কেন দলীয় নেতৃত্বকে জানাননি? নাকি জানানো সত্ত্বেও কিছুই হয়নি?

রাজভবনে মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে শান্তনু
শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় গত বছর রাজ্য মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে রাজভবনে উপস্থিত ছিলেন। নিশ্চিতভাবেই সেখানে যে কেউ হঠাৎ হাজির হতে পারেন না। শান্তনুর নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে সেই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের একাধিক ছবি রয়েছে। সেদিন উপস্থিত ছিলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বর্তমানে রাজ্যের এক মন্ত্রীর সঙ্গেই সেদিন শান্তনু রাজভবনে যান বলে জানা গিয়েছে।

কার সঙ্গে গিয়েছিলেন?
স্নেহাশিস চক্রবর্তী সেদিনই মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। শান্তনু বিধানসভায় গিয়ে তাঁকে পুষ্পস্তবক নিয়ে অভিনন্দন জানান। শান্তনু এরপর স্নেহাশিসের সঙ্গেই রাজভবনে গিয়েছিলেন বলে জানাচ্ছেন তাঁর ঘনিষ্ঠরা। শান্তনুকে তার আগে একাধিক দলীয় কর্মসূচিতে দেখা গিয়েছে স্নেহাশিসের সঙ্গে। মিছিল, জনসভা থেকে ইফতার পার্টি বিভিন্ন সময় দেখা গিয়েছে স্নেহাশিস-শান্তনুকে।

দিলীপের সঙ্গে শান্তনু-কুন্তল
স্নেহাশিস চক্রবর্তী যেমন হুগলি জেলায় দলের সভাপতি ছিলেন, তেমনই সেই দায়িত্ব সামলেছেন দিলীপ যাদবও। দিলীপ যাদবের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে শান্তনুর সঙ্গে দেখা গিয়েছে 'নিয়োগ দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড' কুন্তল ঘোষকে। ফলে দুর্নীতির জাল কতটা গভীরে তা খুঁজে বের করাই ইডির বড় চ্যালেঞ্জ।

স্নেহাশিসের প্রতিক্রিয়া মেলেনি
শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় বিগত কয়েক বছর ধরে নিয়োগ দুর্নীতিতে যুক্ত বলে উঠে আসছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তদন্তে। সে সম্পর্কে দলের রাজ্য নেতৃত্ব যদি অন্ধকারেও থাকে, তাহলে তা তো সাংগঠনিক ব্যর্থতাও। স্নেহাশিস চক্রবর্তী রাজভবনে শান্তনুকে নিয়ে গিয়েছিলেন কিনা তা জানতে রাজ্যের মন্ত্রীকে ওয়ানইন্ডিয়া বাংলার তরফে দু-বার ফোন করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি। মেসেজের উত্তর আসেনি। স্নেহাশিস চক্রবর্তী যদি কিছু জানান তা এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।












Click it and Unblock the Notifications