হায় শিক্ষা! দুর্নীতিগ্রস্থ প্রধানশিক্ষককেই কমিটির মাথায় বসালেন তদন্তকারী এসআই
দেখা যাচ্ছে এসআই সুস্মিতা মুখোপাধ্যায়ের বদন্যতায় বরাহনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সর্কেল স্পোর্টস কমিটির মাথায় বসানো হয়েছে অভিযুক্ত শিক্ষক মণীশ নেজকে। এমন একজন শিক্ষক যার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলছে।
সরকারি স্কুলে বসে বাইরের প্রকাশনা সংস্থার বই বিক্রি থেকে শুরু করে ছাত্র-ছাত্রীদের ধরে মারধর। বরাহনগরের শরৎচন্দ্র ধর প্রাথমিক বিদ্যামন্দিরের প্রধানশিক্ষক মণীশ নেজ-এর বিরুদ্ধে এমনই সব গুরুতর অভিযোগের কয়েকটি ভিডিও অক্টোবর মাসে ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেই ভিডিও পৌঁছেছিলো ওয়ানইন্ডিয়া বেঙ্গলির হাতেও। ওয়ানইন্ডিয়া বেঙ্গলি-সহ বিভিন্ন ডিজিটাল মিডিয়া এবং প্রিন্ট মিডিয়াতেও সেই প্রতিবেদন প্রকাশিত। ঘটনায় তদন্তেরও নির্দেশ দেন উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসক অন্তরা আচার্য। যার ভিত্তিতে তদন্তও শুরু করে ডিআই অফ স্কুলস। ১০ অক্টোবর হওয়া শুনানিতে সমস্ত দোষ স্কীকার করে নেন অভিযুক্ত শিক্ষক মণীশ নেজ। এরপর এই বিষয়ে চার্জশিট জমা করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বরাহনগরের স্কুল পরিদর্শক সুস্মিতা মুখোপাধ্যায়কে। তাঁকে এনকোয়ারি অফিসার হিসাবেও দায়িত্ব দেন ডিআই অফ স্কুলস সঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়।

কিন্তু, কথাতেই আছে ঠগ বাছতে গাঁ উজার। একমাস কেটে গেলেও সেই চার্জশিট জমা তো পড়েইনি। উল্টে দেখা যাচ্ছে এসআই সুস্মিতা মুখোপাধ্যায়ের বদন্যতায় বরাহনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সর্কেল স্পোর্টস কমিটির মাথায় বসানো হয়েছে অভিযুক্ত শিক্ষক মণীশ নেজকে। এমন একজন শিক্ষক যার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুধু চলছেই না সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বছরের পর বছর স্কুলে বাইরের প্রকাশনা সংস্থার বই বিক্রি করেছেন। ছাত্রদের শারীরিক শাস্তি দিয়েছেন। তেমন শিক্ষককে কীভাবে সার্কেল স্পোর্টস কমিটির মাথায় বসিয়ে দেওয়া হল? এই প্রশ্ন করা হয়েছিল এই ঘটনায় তদন্তাকারী অফিসার তথা এসআই সুস্মিতা মুখোপাধ্যায়কে।
এসআই সুস্মিতা মুখোপাধ্যায় অদ্ভুত যুক্তি দেখান। তিনি দাবি করেন যে তাঁর কাছে কোনও লিখিত অর্ডার নেই যে মণীশ নেজের বিরুদ্ধে এমন কোনও তদন্ত চলছে। এমনকী তিনি মানতে অস্বীকার করেন যে প্রধানশিক্ষক হিসাবে মণীশ নেজ সরকারি নিয়ম ভেঙেছেন এবং পড়ুয়াদের শারীরিক শাস্তি দিয়ে এক শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছন। অথচ, মণীশ নেজ-এর বিরুদ্ধে তদন্তে ডিআই অফ স্কুলস-কেও একটি রিপোর্ট জমা করেছিলেন এই সুস্মিতা মুখোপাধ্যায়। এমনকী, ১০ অক্টোবর বারাসতে স্কুল শিক্ষা দফতরে যে শুনানি হয় সেখানেও অন্যতম আধিকারিক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই শুনানি শেষে ডিআই সঞ্জয় কুমার চট্টোপাধ্যায় মণীশ নেজের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল-সহ বিভাগীয় তদন্তের কার্যপ্রণালী সম্পন্ন করার দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন তাঁকে। তারপরেও এসআই সুস্মিতা মুখোপাধ্যায় কীভাবে মণীশ নেজকে ক্লিন-চিট দিয়ে একটি কমিটির মাথায় বসান তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ওয়ানইন্ডিয়া বেঙ্গলি তাদের প্রতিবেদনে তুলে ধরেছিল কীভাবে একজন সাধারণ শিক্ষক থেকে প্রধানশিক্ষকের পদ পেয়েছিলেন মণীশ নেজ। এমনকী, এই দায়িত্ব পাওয়ার পর যে তিনি বরাহনগর শরৎচন্দ্র বিদ্য়ামন্দিরের প্রাথমিক বিভাগে ক্ষমতার অপব্যবহার করে যাচ্ছেন তা বিভিন্ন প্রমাণের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছিল। পড়ুয়াদের শারিরীক নিগ্রহ, স্কুলে বই বেচা-র মতো গুরুতর অভিযোগ মণীশ নেজের বিরুদ্ধে রয়েছে, সেইসঙ্গে আছে ডোনেশন নিয়ে স্কুলে পড়ুয়া ভর্তির মতো অপরাধের অভিযোগ। শিক্ষার অধিকার আইনে স্পষ্ট করেই বলা আছে যে সরকারি স্কুলে কোনওভাবেই ডোনেশন নিয়ে পড়ুয়া ভর্তি করা যাবে না। স্কুল ভবনের উন্নয়নে আসা অর্থও কীভাবে নিজের পকেটে পোরেন সে অভিযোগও সামনে এসেছে। কিশোর ভার্মা নামে এক লেবার কন্ট্রাক্টর এক ভিডিও-তে নিজেই জানিয়েছিলেন কীভাবে স্কুল বাসভবনের উন্নয়নের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন মণীশ নেজ।

এই সমস্ত ভিডিও উত্তর ২৪ পরগনা জেলা স্কুল শিক্ষা দফতরকেও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু, শুনানিতে শুধুমাত্র মণীশ নেজকে পড়ুয়াদের মারধর ও বই বেচা নিয়েই প্রশ্ন করা হয়েছিল। অথচ বাকি দুর্নীতি নিয়ে কোনও কথাই বলা হয়নি। চলতি বছরের মাঝামাঝি উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসককে উদ্দেশ্য করে নাম-পরিচয় অজ্ঞাত রাখা বহু প্রাথমিক শিক্ষক মণীশ নেজের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেছিলেন। সেই চিঠির প্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু হলেও মণীশ নেজ-র গায়ে একটি আঁচড় পড়়েনি। সুতরাং, এটা দিনের আলো-র মতোই পরিস্কার যে মণীশ নেজ-কে যেন-তেন প্রকারে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে। এমন একজন দুর্নীতিবাজ, পড়়ুয়াদের গায়ে হাত তুলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করা প্রধানশিক্ষককে বাঁচাতে কেন মরিয়া হয়ে উঠেছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা শিক্ষা দফতর? এই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে।
দুর্নীতিবাজ, সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখানো এবং এক অপরাধী প্রধানশিক্ষক-কে শিক্ষারত্ন-এর মতো সম্মানও পাইয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। যে শিক্ষক শিক্ষাদানের সময় স্কুলেই থাকেন না, ক্লাসেও অনুপস্থিত থাকেন, এমনকী শিক্ষাদানের সময় অন্য স্কুলে গিয়ে শিক্ষক সংগঠন করার জন্য দলবল নিয়ে চড়়াও হন- তাঁকে কোন ক্ষমতাবলে শিক্ষারত্ন দেওয়া হচ্ছে তা নিয়েও শিক্ষা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সন্দেহ নেই মণীশ নেজ যথেষ্টই ক্ষমতাবান। কিন্তু সেই ক্ষমতা কী সরকারি নিয়ম-কানুন এবং শিক্ষার অধিকার আইনের থেকেও বড়! আর সেই কারণে স্কুল পরিদর্শক সুস্মিতা মুখোপাধ্যায় তদন্তকারী অফিসার হয়েও মণীশ নেজ-কে এক নতুন কমিটির মাথায় বসিয়ে দিতে তৎপর হন?
এসআই সুস্মিতা মুখোপাধ্যায়-এর এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ওয়ানইন্ডিয়া বেঙ্গলি কথা বলেছিল ডিআই সঞ্জয় কুমার চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও। তিনি পরিস্কার জানিয়ে দেন, এসআই এমনটা করতে পারেন না। আর তিনি যেখানে তদন্তকারী অফিসার। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে তিনি দেখছেন বলেও জানিয়েছেন। এসআই সুস্মিতা মুখোপাধ্যায় এবার কী বলবেন?












Click it and Unblock the Notifications