রিজার্ভ নিয়ে কতোটা স্বস্তিতে আছে বাংলাদেশ

অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি দেশের তিন মাসের আমদানির খরচের সমমানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অবশ্যই থাকতে হয়। সে হিসেবে বাংলাদেশে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মত বৈদেশিক মুদ্রা মজুদ আছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ

ডলার
Getty Images
ডলার

বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ কমে যাওয়ায় অর্থনীতিবিদ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করলেও রিজার্ভ যথেষ্ট পরিমাণে আছে বলে দাবি করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বৃহস্পতিবার দেশটির বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, “বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে অনেকেই নানা মনগড়া মন্তব্য করছেন। আমাদের বিনিয়োগ, রেমিটেন্স প্রবাহ এবং আমদানি-রফতানি পরিস্থিতি সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে।”

গত বছরের অগাস্ট নাগাদ বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছালেও এখন সেটি ২৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশে ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট রিজার্ভের পরমাণ ৩৪.৩ বিলিয়ন ডলার। সেখান থেকে বিভিন্ন তহবিলে বিনিয়োগ করা এবং ঋণ হিসেবে দেয়া আট বিলিয়ন ডলার বাদ দিলে নেট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬.৩ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি দেশের তিন মাসের আমদানির খরচের সমমানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অবশ্যই থাকতে হয়।

সে হিসেবে বাংলাদেশে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মত বৈদেশিক মুদ্রা মজুদ আছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২৬ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ দিয়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর হিসাবটি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, “আমাদের থাম্বরুল আছে যে প্রতি মাসে গড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার আমদানির জন্য লাগে। সে হিসেবে সরকারের কাছে বড় জোর তিন মাসের কিছুটা বেশি রিজার্ভ আছে বলা যায়। পাঁচ মাসের নেই।”

তবে তিন মাসের এই রিজার্ভ থাকাকেও তিনি স্বস্তির বলে মনে করছেন না। কারণ এই রিজার্ভের পরিমাণ প্রতিনিয়ত ওঠানামা করছে। রিজার্ভ থেকে প্রতিনিয়ত অর্থ বেরিয়ে গেলেও সেই পরিমাণে যোগ হচ্ছে না।

তিনি বলেন “তিন মাসের রিজার্ভ থাকাটাও নিরাপদ হতো, যদি সেটা স্থির থাকতো। কিন্তু বাংলাদেশে রিজার্ভে যে ক্ষয়টা হচ্ছে সেটা তো পূরণ করা যাচ্ছে না, কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি আমদানি নির্ভর। এ কারণে রপ্তানির চাইতে আমদানি ব্যয় বেশি থাকে। এজন্য রিজার্ভ কমছে আবার রেমিট্যান্স কমে যাওয়ায় নতুন করে সেভাবে যুক্ত হচ্ছে না।”

বৈদেশিক মুদ্রা
Getty Images
বৈদেশিক মুদ্রা

রিজার্ভের নিম্নমুখীতা বিপদজনক

একটি দেশের রিজার্ভ হল সেই দেশটির রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স, বিদেশি বিনিয়োগ, বিভিন্ন দেশে বা সংস্থা থেকে পাওয়া ঋণ বা অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ।

সেই মজুদ থেকে আবার অনেক অর্থ খরচ হয়ে যায়। যেমন আমদানি, ঋণের সুদ বা কিস্তি পরিশোধ, বিদেশি কর্মীদের বেতন-ভাতা, পর্যটন বা বিদেশে শিক্ষা ইত্যাদি খাতে খরচ হয়।

মোট মজুদ থেকে এই খরচ বাদ দেয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে যা সঞ্চিত থাকে, সেটাই নেট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ।

করোনাভাইরাস ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও খাদ্য পণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়া, সেইসাথে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় রিজার্ভের মজুদ কমে এসেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

এর ফলে বাণিজ্য ঘাটতিও ক্রমেই বাড়ছে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবরে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ বিলিয়ন ডলার হলেও আয় হয়েছে ৪.৩৫ বিলিয়ন ডলার৷ অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় ১২.৮৭% কমেছে৷

চলতি অর্থবছরের জুন-জুলাই থেকে প্রবাসী আয় রকেট গতিতে কমেছে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে এই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। রেমিট্যান্স এক ধাক্কায় ৫০ কোটি ডলার কমে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত অক্টোবরে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন ১.৫২ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি৷ যা গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় প্রায় সাড়ে সাত শতাংশের কম।

বাংলাদেশ ব্যাংক
BBC
বাংলাদেশ ব্যাংক

বৈদেশিক রিজার্ভকে একটি দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি ধরা হয়। কারণ বৈদেশিক লেনদেন হয় ডলারে। তাই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকা মানে আমদানির সক্ষমতা থাকা।

বাংলাদেশ আমদানি নির্ভর দেশ হওয়ায় এখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ভারসাম্য থাকাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ, বলছেন অর্থনীতবিদরা।

বৈদেশিক মুদ্রার যথেষ্ট সঞ্চয় থাকলে বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের জন্য বৈদেশিক ঋণ নেয়াও সহজ হয়।

ফলে রিজার্ভের অর্থ কমে যাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বিপদজনক হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন ফাহমিদা খাতুন।

তিনি বলেন, “গত কয়েক মাস ধরে রিজার্ভের নিম্নমুখীতা দেখছি। কমছে আর কমছে। এমনটা চলতে থাকলে তো এটা তো চিন্তার বিষয়। কিন্তু আমাদের আমদানি বন্ধ করারও উপায় নেই, আমাদের জ্বালানি তেল, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সব আমদানি করতে হবে।”

তবে রিজার্ভের অর্থ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মানুষের কল্যাণে এবং তাদের ভালোমন্দের জন্য রিজার্ভের টাকা খরচ হয়েছে।

তিনি জানান, করোনাভাইরাস মহামারির সময় সব ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি আমদানি, বিদেশ ভ্রমণ এবং অন্যান্য পণ্য আমদানি অনেকটা বন্ধ ছিল। সে সময় রিজার্ভ বেড়ে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়।

এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অলস অবস্থায় না রেখে সেখান থেকে কিছু পরিমাণ অর্থ দিয়ে একটা বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে।

সেই তহবিলের অর্থ দিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে তিনি বলেন, “সোনালি ব্যাংকের মাধ্যমে এই ঋণ দেওয়া হচ্ছে ২% হার সুদে। ঘরের টাকা সুদসহ ঘরেই ফেরত আসছে। এ অর্থ যদি বিদেশি ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়া হতো তাহলে ৪/৫ শতাংশ হারে সুদসহ ফেরত দিতে হতো। আর তা পরিশোধ করতে হতো রিজার্ভ থেকেই।”

এদিকে রিজার্ভ কমার কারণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে জ্বালানি তেল, ভোজ্য তেল, গম, ভাল, ভুট্টাসহ অন্যান্য পণ্য কিনে দেশের বাজারে স্বল্পমূল্যে বিক্রি করার কারণে এর একটি প্রভাব গিয়ে পড়েছে রিজার্ভে।

তবে ব্যাংক ও রিজার্ভ নিয়ে সাম্প্রতিক বিভিন্ন খবরকে গুজব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন সেসবে কান না দিতে।

তিনি বলেন, ব্যাংকে টাকা নেই বলে গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। অযথা গুজবে কান দিবেন না। ব্যাংকে টাকার কোন ঘাটতি নেই। উপার্জিত টাকা ঘরে রেখে বিপদ ডেকে আনবেন না।”

ডলার
Getty Images
ডলার

করণীয় কী

এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, একটি দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে রিজার্ভ থাকলে বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের জন্য বৈদেশিক ঋণ নেয়ার পরিবর্তে রিজার্ভের অর্থ বিনিয়োগ করা যায়।

এক্ষেত্রে হঠাৎ কোন সংকট হলে রিজার্ভে সেই বিনিয়োগকৃত অর্থ দ্রুত ফেরানো সম্ভব হবে কি না সেটা নিরূপণ করা জরুরি বলে তিনি মনে করছেন।

তার মতে, সরকার রিজার্ভের টাকায় যে তহবিল করেছে সেটা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যই ব্যবহার হচ্ছে।

কিন্তু সমস্যা হল, দেশীয় বিনিয়োগ থেকে যে আয় হচ্ছে সেটি টাকায় হয়, ডলারে নয়।

এই বিনিয়োগের টাকাটা একবারে বেরিয়ে গেলেও সেখান থেকে আয় আসে ধীরে ধীরে। যার কারণে হঠাৎ রিজার্ভের দরকার পড়লে সেটা তৎক্ষণাৎ পাওয়ার উপায় থাকে না।

অন্যদিকে, রপ্তানি-মুখী বিনিয়োগ হলে সেটা বৈদেশিক মুদ্রা আনতে কাজে লাগে। এবং সেই বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে দ্রুত যুক্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি যেহেতু রপ্তানি-মুখী নয় সেকারণে রিজার্ভের অর্থ দেশীয় খাতে বিনিয়োগ করলে রিজার্ভে সংকট সৃষ্টির ঝুঁকি থেকেই যায় বলে তিনি জানান।

রিজার্ভের এই সংকট কাটাতে সরকারকে চার ধাপে পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ফাহমিদা খাতুন।

প্রথমত অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসবহুল পণ্য আমদানী নিয়ন্ত্রণ করা।

দ্বিতীয়ত, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স যেন ব্যাংকিং চ্যানেলে আসে সে ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ নেয়া।

তৃতীয়ত, ডলার এবং টাকার বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা আনা। যেন সব জায়গায় দাম সমান বা কাছাকাছি থাকে।

সবশেষে আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অনেক ডলার বিদেশে রয়ে যাচ্ছে, সেগুলো দেশের অর্থনীতিতে যোগ করার ব্যবস্থা করা।

আমদানিকারক ১০০ ডলারের এলসি খুললেন এবং ব্যাংক থেকে সেই টাকা বিদেশে চলে গেল। কিন্তু তিনি কিনলেন ৩০ ডলারের পণ্য। বাকি ৭০ ডলার তিনি বিদেশের অ্যাকাউন্টে রেখে দিলেন। এটি ওভার ইনভয়েসিং।

অন্যদিকে আন্ডার ইনভয়েসিং হল রপ্তানিকারক বিদেশে ১০০ টাকার পণ্য বিক্রি করলেন কিন্তু দেশে আনলেন ৩০ ডলার। বাকিটা বিদেশের অ্যাকাউন্টে রেখে দিলেন।

এই বৈদেশিক মুদ্রাগুলো দেশে আনার ব্যবস্থা করলে রিজার্ভে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফেরানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+