কংগ্রেস হাইকম্যান্ডের দোষেই কি মধ্যপ্রদেশে গাড্ডায় কমলনাথ সরকার?
কংগ্রেস হাইকম্যান্ডের দোষেই কি মধ্যপ্রদেশে গাড্ডায় কমলনাথ সরকার?
মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেসের সরকার পতন এখন শুধু মাত্র সময়ের অপেক্ষা। কারণ শেষ পর্যন্ত জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার সঙ্গে কংগ্রেসের দ্বন্দ্বের ওপেন সিক্রেট আর সিক্রেট রইল না। কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করে বিজেপির পথেই পা বাড়ালেন জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। সাধারণ মানুষের চোখে কংগ্রেসের এই সঙ্কটময় পরিস্থিতি কয়েকদিন ধরে হলেও আদতে এই সঙ্কট তৈরি হওয়ার সূত্রপাত দুই বছর আগে থেকেই।

কংগ্রেস বিধায়কদরা ব্যাঙ্গালোরে পৌঁছাতেই পতন শুরু কমলনাথের
কয়েকদিন আগেও জাতীয় রাজনীতিতে এই দাসোঁ নিয়েই কংগ্রেস পরপর আক্রমণ শানিয়েছিল বিজেপিকে। বিজেপিকে দুর্নীতির কালিমায় লিপ্ত করতে চেয়েছিল কংগ্রেস। সেই বল সুপ্রিমকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল, তবে আইনের মায়াজালে কংগ্রেস সেই ইস্যু থেকে খুব একটা ফায়দা তুলতে পারেনি। আর ভাগ্যের কী পরিহাস; সেই দাসোঁরই একটি বিমানে করে সোমবার ব্যাঙ্গালোরে আনা হয় কংগ্রেসের ১৭ জন বিধায়কদের। যার জেরে রীতিমতো কুপোকাত হয়ে যায় মধ্যপ্রদেশে কমলনাথের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের সরকার।

২০১৮ সালেই ঘটনার সূত্রপাত
ঘটনার সূত্রপাত, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর। ছত্তিসগড় ছাড়াও রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে হারিয়ে বড় জয়লাভ করে কংগ্রেস। রাজনৈতিক মহল সেই সময় আশা করে, কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ সুদৃঢ় করতে ও পরবর্তী প্রজন্মকে দলের দিকে টানতে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি ফ্রন্টফুটে খেলবে কংগ্রেস। সেই মতো রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী পদে দেখা হচ্ছিল সচিন পাইলটকে। একই রকম ভাবে মধ্যপ্রদেশের মুখঅযমন্ত্রী হিসাবে দেখা হচ্ছিল কংগ্রেস নেতা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকে।

মানসিকতা পরিবর্তনে ব্যর্থ কংগ্রেস
তবে ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল এই রাজ্য দুটিতে রাজ্যপাটের পরিবর্তন ঘটাতে পারলেও, মানসিকতায় বদল আনতে সক্ষম হয়নি। মধ্যপ্রদেশ এবং রাজস্থান দুটি রাজ্যেই মুখ্যমন্ত্রী পদের একাধিক দাবিদার ছিলেন। আর এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই কংগ্রেস হাইকমান্ডের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে নিরাপদে খালের দিকেই ঝোঁকেন তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। গান্ধীদের অনুগত হিসাবে পরিচিত অশোক গেহলোতকে দেওয়া হয় রাজস্থানের দায়িত্ব। একই ভাবে, জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার বদলে মধ্যপ্রদেশের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় কমলনাথের হাতে। আর বর্তমানে মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেসের যেই পরিস্থিতি, তার জন্য হয়ত কংগ্রেস হাইকমান্ডের এই সিদ্ধান্তই দায়ি।

লোকসভা নির্বাচনে হারের পিছনে কি জ্যোদিরাদিত্য?
সেই রাজনৈতিক বোদ্ধারা ভেবেছিলেন যে পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনকে মাথায় রেখেই এই দুই বর্ষীয়ান নেতাকে খুশি করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কংগ্রসের তরফে। তবে সেই সময় কংগ্রেস তৃণমূল স্তরে দলের হয়ে কাজ করা জ্যোতিরাদিত্য ও সচিনকে ভুলে যায়, বা বলা ভালো উপেক্ষা করে। সেই খেসারত কিন্তু কংগ্রেসকে দিতে হয় লোকসভা নির্বাচনে। কয়েকমাস আগেই যেই রাজ্যগুলিতে কংগ্রেস বিজেপি থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে আনে, সেই রাজ্যগুলিতে ধরাশায়ী হয় কংগ্রেস। মধ্যপ্রদেশে তো তাদের ঝুলিতে আশে কেবল মাত্র একটি আসন।

লোকসভা নির্বাচনে হারেও শিক্ষা হয়নি কংগ্রেসের
অবশ্য লোকসভা নির্বাচনের হার থেকেও কংগ্রেসের শিক্ষা হয়নি। রাহুল গান্ধী দলের সভাপতি পদ থেকে সরে দাঁড়ালেও রাজ্যগুলিতে কংগ্রেসের মাথায় থেকে যান গান্ধী ঘনিষ্ঠরা। আর এর জেরে মধ্যপ্রদেশে ধীরে ধীরে অন্তরদ্বন্দ্ব সামনে আসতে থাকে। এই অন্তর্দ্বন্দ্ব সামনে চলে এসে বহুবার কংগ্রেস ও কমলনাথকে অস্বস্তিতে ফেলে। তবে প্রতিবারই টিকে থাকে মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেস সরকার। তবে প্রশ্ন উঠতেই থাকে। আর কত দিন?

কংগ্রেস না 'অপারেশন কমল', দোষ কার?
সেই প্রশ্নেরই জবাব হয়ত শীঘ্রই পেতে চলেছে দেশ। আর বেশিক্ষণ নয়। মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেস সরকারের মেয়াদ এখন জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার হাতে। যতই কংগ্রেস বলুক বিজেপি কর্নাটকের মতো মধ্যপ্রদেশেও 'অপারেশন কমল'-এর মাধ্যমে সরকার ফেলে দিতে সচেষ্ট হয়েছে, তারা নিজেরাও জানে, সিন্ধিয়ার এই রাজনৈতিক পালাবদল কিন্তু তাদের দোষেই হয়েছে। এর আগেও জ্যাতিরাদিত্য সংসদে বিজেপির আনা ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের বিলকে সমর্থন করেছিলেন পার্টি লাইন থেকে সরে গিয়ে। তখনও সময় ছিল কংগ্রেসের হাতে, বিক্ষুব্ধ নেতার অভিমান ভাঙানো। কারণ জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া কিন্তু মধ্য ভারতে কংগ্রেসের এক স্তম্ভ ছিলেন।

মন্ত্রীরাও কমলনাথের সঙ্গ ছাড়েন
সোমবার কমলনাথের মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়। সেখানে মন্ত্রিসভআর ২০ জন মন্ত্রী ইস্তফা দেন। অবশ্য এরপরও বিক্ষুব্ধদের মন জয় করার বদলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানোর বৃথা চেষ্টা জারি রাখে কংগ্রেস। নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের কথা বলা হয় কংগ্রেসের তরফে। তবে সেই সময় তারাও জানত দিন ঘনিয়ে এসেছে। তবে সেই বিজেপির ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে কমলনাথ বলেন, 'কোনও রকম অস্থিরতা ছুঁতে দেবেন না মধ্যপ্রদেশকে। মাফিয়ার সাহায্য নিয়ে যারা মধ্যপ্রদেশকে অস্থির করে তুলতে চাইছে, আমি তাদের সফল হতে দেব না। আমরা সব থেকে বড় শক্তিই হল বিশ্বাস ও মধ্যপ্রদেশের মানুষের ভালবাসা। যে সব শক্তি সরকারের স্থিতাবস্থাকে নষ্ট করতে চাইছে তাদের কিছুতেই সফল হতে দেব না। এই সরকার গড়েছে মধ্যপ্রদেশের আমজনতা।'

শেষ রক্ষা হয়নি কমলনাথের
তবে শেষ রক্ষা হয়নি। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে দেখা করেন। জানা যায় তার আগের দিনই কংগ্রেস ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন জ্যোতিরাদিত্য। সনিয়া গান্ধীকে চিঠি লিখে নিজের ইচ্ছা জানিয়ে দেন তিনি। আর এর সঙ্গেই কর্নাটকের মতো কয়েক মাস ক্ষমতায় থেকেই মধ্যপ্রদেশ থেকেও সরে যেতে চলেছে কংগ্রেস। এখন কংগ্রেসের সরকার পতন শুধু সময়ের অপেক্ষা। তবে মধ্যপ্রদেশে কমলনাথের এই পতনের পিছনে কংগ্রেসের মান্ধাতা আমলকে আঁকড়ে ধরে রাখার মানসিকতাই দায়ি।












Click it and Unblock the Notifications