'অতীত ভুলে যাও, তোমরাই ঘুরে দাঁড়াবে', ভারতীয় মেয়েদের পিঠ চাপড়ে মাঠে নামালেন ডেননার্বি
'অতীত ভুলে যাও, তোমরাই ঘুরে দাঁড়াবে', ভারতীয় মেয়েদের পিঠ চাপড়ে মাঠে নামালেন ডেননার্বি
ফিফা অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপকে ঘিরে ধীরে ধীরে প্রত্যাশার যে বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল ভারতীয় সমর্থকদের মনে তা অচিরেই সমাপ্তির পথে। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ভারতীয় মহিলা দলকে স্বাগত জানাতে কোনও কার্পণ্য করেনি কলিঙ্গ স্টেডিয়াম। নবীন পট্টনায়কের উদ্যোগে আতশ বাজির রোশনাইয়ের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় অনূর্ধ্ব-১৭ মহিলা দলকে স্বাগত জানায় ওড়িশা সরকার। হকি প্রধান রাজ্যে বিশ্বকাপের সফল আয়োজনের সমস্ত ব্যবস্থা করেছিল তাঁর প্রশাসন। কিন্তু আমেরিকার বিরুদ্ধে বিধ্বস্ত হয়ে অষ্টম ওঁরাও, কাজল ডি সুজা, অঞ্জলি মুন্ডারা যে ভাবে মাথা নীচু করে মাঠ ছাড়েন সেই দৃশ্যের আশা হয়তো করেননি কেউই।

অষ্টমদের পিঠ চাপড়ে ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্র দিলেন ডেননার্বি:
ম্যাচের ২০ ঘণ্টা কেটে যায়ার পরেও থমাস ডেননার্বির দলের মেয়েদের চোখে মুখে স্পষ্ট পরাজয়ের ছাপ। বুধবার বিকেলে স্টেডিয়াম লাগোয়া ক্যাপিটেল হাই স্কুল গ্রাউন্ড-এর ময়দানে ডেননার্বি মেয়েদের নিয়ে অনুশীলনে নেমেছিলেন। কঠিন পরিশ্রমের পরিবর্তে সিচ্যুয়েশন প্র্যাকটিস এবং ডেড বল সিচ্যুয়েশনের উপর জোর দেন তিনি। দলের মধ্যে গুমোট ভাবটা কাটানোর উদ্দ্যোগ নেন কোচ স্বয়ং। অনুশীলন শুরুর আগে দলকে নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা করেন এবং পিঠ চাপড়ে দেন। খারাপ একটা ম্যাচের পরেও কোচের পাশে থাকার বার্তা পেয়ে বৃষ্টির মধ্যেই অনুশীলনে প্রাণ লড়িয়ে দেন মেয়েরা। যেন প্রত্যেকে শপথ নিয়েই নেমেছেন ম্যাচ হোক কিংবা প্র্যাকটিস আর একটা ভুলও করা যাবে না। মেয়েদের তিনি বলেছেন, "অতীত ভুলে যাও, তোমরাই ঘুরে দাঁড়াবে।"

সূর্য উঠবেই এবং নতুন সকালের দেখা পাবো:
মহিলা ফুটবলের মহিরূহ কোচ থমাস ডেননার্বি। মেয়েদের ফুটবলে তাঁকে সর্বকালের অন্যতম সেরা কোচেদের তালিকায় রাখেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁর হাতে পড়েই ফিফা মহিলা বিশ্বকাপ ২০১১-এ ব্রোঞ্জ জিতেছিল সুইডেন। ভারতীয় শিবিরের খবর, মঙ্গলবার রাত্রে হারের পর ড্রেসিংরুমে থমাস মেয়েদের বলেছেন, "ভেঙে পরার কোনও কারণ নেই। সূর্য উঠবেই এবং নতুন সকালের দেখা পাবো।" তবে, আট গোল হজমের ধাক্কা সামলে উঠে নতুন প্রভাতের দেখা পেতে মেয়েদের যে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে তা ভালভাবেই বুঝতে পারছেন ভারতীয় মহিলা দলের প্রশিক্ষক।

হারের দোষ মেয়েদের দিতে নারাজ ডেননার্বি, নিজেকেও দোষ দিতে রাজি নন:
আমেরিকার বিরুদ্ধে এই হারের জন্য অনূর্ধ্ব-১৭ ভারতীয় দলের ফুটবলারদের একটুও দোষ দিতে রাজি নন ডেননার্বি। রাজি নন নিজেকে দোষ দিতেও। ফুটবলার জীবনে এবং কোচিং জীবনে কখনও এত গোল তিনি হজম করেননি জানানোর সঙ্গেই মনে করিয়ে দিয়েছেন এক জন কোচই সেই দলের মুখ হয়। ফলে তাঁর পক্ষে ভেঙে পড়ার কোনও জায়গা নেই। সেনাপতিই যদি হাল ছেড়ে দেয় বাকি সৈন্যরা তো যুদ্ধ করার মনোবলই পাবে না। তিনি বলেছেন, "আমাকে ভেঙে পড়লে চলবে না। মেয়েদের বলেছি খেলায় জয়-পরাজয় আছেই। ইউএসএ-এর বিরুদ্ধে যে ভুলত্রুটিগুলো হয়েছে তা আমাদের দ্রুত ঠিক করে নিতে হবে। আমিই যদি ভেঙে পড়ি তা হলে তো দলের এই বাচ্চা বাচ্চা মেয়েগুলো আরও বেশি করে ভেঙে পড়বে।"

এত শক্তিধর দলের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ পায়নি ভারত:
বিশ্বকাপের আগে একাধিক ইউরোপ সফর করলেও আমেরিকার মানের দলের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ না পাওয়াটা এই হারের অন্যতম কারণ মনে করেন ডেননার্বি। তিনি জানিয়েছেন বিশ্ব মহিলা ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দেশ আমেরিকা এবং তাদের অনূর্ধ্ব-১৭ দলও যে সেই মানেরই হবে সেটাই স্বাভাবিক। তিনি দীর্ঘক্ষণ আলোচনার সময়ে বলছিলেন, "ওদের (আমেরিকার) দক্ষতা, শরীরী ক্ষমতা এবং পরিশ্রমেরা কাছে হার মানলো আমার মেয়েরা। তবে, আমি আশাবাদী এই দলকে নিয়ে, এখনও দুই ম্যাচ রয়েছে। আমাদের ঘুরে দাঁড়াতেই হবে।" সুইডিশ কোচ অজুহাত দেন না, অজুহাত দিতে পছন্দ করেন না কিন্তু তিনি যখন ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে খেলেও আমেরিকার মানের দলের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ পাননি জানিয়েছেন তখন আমেরিকার দল কতটা শক্তিশালী তা তাঁর এই কথা থেকেই বোঝা যায়।

বড় মঞ্চে স্নায়ুর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনি মেয়েরা:
থমাস মনে করেন মেয়েরা অনেকটা নার্ভাস হয়ে গিয়েছিল এই ম্যাচে। ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে যে কথা বলেছিলেন সেই একই কথা এ দিনও বললেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তাঁর সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন বলছিলেন, "আমার মনে হয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কিছুটা নার্ভাস হয়ে গিয়েছিল মেয়েরা। প্রথম গোল হজম করার পর আরও খেই হারিয়ে ফেলে। এবারই বিশ্বকাপের মঞ্চে ওরা প্রথম নেমেছে, তাই এমনিতেই চাপটা নিতে পারেনি, তা ছাড়া এই স্তরে এই ধরনের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করাটাও কঠিন।"

বড় ব্যবধানে হারালেও ভারতীয় দলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আমেরিকার কোচ:
ভারতের বিরুদ্ধে সহজ জয় পেলেও প্রতিপক্ষকে একেবারেই ছোট করেননি আমেরিকার কোচ সিমোনে। তিনি বলেছেন, "৯০ মিনিট পর্যন্ত ওরা (ভারত) আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গিয়েছে। বার বার পিছিয়ে পড়েও হাল ছাড়েনি, চেষ্টা করেছে লড়াই দেওয়ার। আপনি কখনওই এই লড়াইকে ছোট করে দেখতে পারেন না। আপনাকে সম্মান জানাতেই হবে এই লড়াইকে।" অপর দিকে, ভারতের বিরুদ্ধে বড় ব্যবধানে জিতলেও বেশি উচ্ছ্বসিত নন আমেরিকার কোচ। তিনি জানিয়েছেন, আমেরিকার ডিএনএ-তে রয়েছে দ্রুত অতীতের কথা মুছে ফেলার তাগিদ। তাই পরের ম্যাচেও সব ভুলে শূন্য থেকেই শুরু করবে দল।
ছবি সৌ:ফিফা/ ফিফা (ভায়া গেটি ইমেজেস)












Click it and Unblock the Notifications