নাবিকের মতোই ভেসে পড়েছিলেন বিশ্বকাপ দেখতে, মুখোমুখি রণজিৎ মুখোপাধ্যায়
রণজিৎ মুখোপাধ্যায় একজন বিখ্য়াত প্রাক্তণ ভারতীয় ফুটবলার। কলকাতা ময়দানে একটা সময় বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল তাঁর।
'ভাবলাম আর বিশ্বকাপ দেখতে চললাম! এমনটা সে জামানায় হত না। আসলে ফুটবল খেলে কত টাকাই বা রোজগার হতো। তিন লক্ষ টাকা জমাতেই মনে হত সারা জীবন কেটে যাবে। আর সেখানে বিদেশে গিয়ে বিশ্বকাপ দেখা! ও তো দিবা স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। তবু একটা আশা জন্মেছিল। যখন শুনলাম ৮৬-র বিশ্বকাপে বাম সরকার উদ্যোগ নিয়ে একটি দল মেক্সিকো-তে পাঠাচ্ছে। এই দলে বেশকিছু প্রাক্তণ ফুটবলারকেও রাখা হয়েছে। এই প্রাক্তণ ফুটবলারদের দলেই একটা নাম ছিল রণজিৎ মুখোপাধ্যায়। খুব গর্ব বোধ হয়েছিল নামটা শুনে। কিন্তু পরে জানলাম এই রণজিৎ মুখোপাধ্যায় একজন আইপিএস। ভুল করে ফুটবলারদের দলে তাঁর নাম ঢুকে গিয়েছে।

মনটাই ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু একটা জেদ চেপে গেল। ঠিক করলাম যে ভাবেই হোক ইটালি যাবোই যাব। টাকা জমাতে শুরু করলাম। ভাগ্যক্রমে সুযোগও মিলল। খড়দায় আমার পাড়ায় একটি ছেলে থিয়েটারের সঙ্গে জড়িত ছিল। সে আবার বিয়ে করেছিল এক ইটালিয়ানকে। শ্বশুরবাড়ি রোম শহরে। থাকার জায়গা পাকা হয়ে গিয়েছিল। শুধু আমাকে বিমানের টিকিট কেটে ইটালি পৌঁছতে হবে।
বাঙালির ছেলে জয়-মা বলে ফুটবলার সঙ্গী বন্ধু নিমাই গোস্বামীকে সঙ্গে করে ইটালি পৌঁছেও গেলাম। এক্কেবারে নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে আমি হাজির বিশ্বকাপের দেশে। কোনও সরকারি বা অন্য কারোর সাহায্য ছাড়াই আমি বিশ্বকাপ দেখতে আসতে পেরেছি ভেবে গর্বে বুকটা ভরে যাচ্ছিল। সাহায্য যে নেয়নি তেমনটাও নয়। আমি বিশ্বকাপ দেখতে ইটালি যাচ্ছি শুনে অমৃত বাজার পত্রিকা একটা চুক্তি করেছিল। তাদের হয়ে আমাকে বিশ্বকাপের কপি লিখে দিতে হবে ইটালি থেকে বিনিময়ে কিছু অর্থ মিলবে। আমিও রাজি হয়ে গিয়েছিলাম।
রোমে পৌঁছে শুরু হল নতুন সমস্যা। থাকার জায়গা তো পেলাম। নিজেরাই রান্না-বান্না করে খাওয়া-দাওয়া করছি। কিন্তু, বিশ্বকাপ দেখব কী করে? কোনও টিকিট নেই। তারমধ্যে আবার এতটাও অর্থ সংস্থান নেই যে মাঠে বসে একটার পর একটা ম্য়াচ দেখব। একদিন সাহস করে হাজির হয়ে গেলাম রোমে ফিফার মিডিয়া সেন্টারে। নিজে একজন ফুটবলার এবং ভারতের জাতীয় দলে খেলি বলে পরিচয় দেওয়াতে একটা সুবিধা হল। ফিফা মিডিয়া সেন্টারের হেড খুবই খাতির করলেন। তিনি বলেও দিলেন এখানে-ওখানে উদভ্রান্তের মতো ঘোরার দরকার নেই। মিডিয়া সেন্টারে বসেই আমার খেলা দেখার বন্দোবস্ত করে দেবেন।
এতবড় সুযোগে মনটা খুশিতে ডগমগ করছিল। রোজ মিডিয়া সেন্টারে যাতায়াত করতাম। তবে কোনও দিনই বাবু হয়ে বসে থাকিনি। মিডিয়া সেন্টারের অন্য কর্মীদেরকে কাজে সাহায্য করতাম। এতে ফিফার কর্ম-কর্তারা আরও খুশি হয়েছিল। ইটালি যাব ভেবে দেশে থাকার সময়ই আমি আবার কিছু চলতি ইটালি শব্দও শিখে নিয়েছিলাম। ফিফার মিডিয়া সেন্টারে আসা ইটালি ভাষাভাষি-র মানুষ আমার মুখে সেই সব চলতি ইটালি শব্দ শুনে খুবই অবাক। ফিফার লোকজনের কাছেও খাতির বেড়ে গেল।

এই সময়েই একদিন মিডিয়া সেন্টারে দেখা হয়ে গেল প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির সঙ্গে। আমাকে দেখতে পেয়ে তো খুব খুশি প্রিয়দা। আমি কোথায় আছি খোঁজ-খবর নিলেন। খেলা দেখার টিকিট পেয়েছি কি না তাও জিজ্ঞেস করে নিলেন। এখানেই আবার দেখা হয়ে গেল, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, পি কে ব্যানার্জি-দের সঙ্গে। প্রদীপদার কোচিং-এ আমি ফুটবল কেরিয়ারের স্বর্ণযুগ কাটিয়েছিলাম। আমাকে দেখে খুব খুশি তিনি। এই মিডিয়া সেন্টারেই দেখা হয়েছিল ১৯৩০ বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম গোলদাতা ফ্রান্সের মঁশিও লুসিও লোর-এর সঙ্গে। ছুটে গিয়েছিলাম পরিচয় করতে। ভারত যে ফুটবল খেলে তা নাকি তিনি জানতেন না। যখন শুনলেন যে আমাদের দেশে ফুটবল মাঠে ২০ হাজারেরও বেশি লোক খেলা দেখতে আসে তখন তিনি অবাকই হলেন। এমনকী তাঁকে জানিয়েছিলাম ভারতে ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা ১০০ বছরের পুরনো। গুলেরমো বলেছিলেন যে দেশে ফুটবল নিয়ে এমন উন্মাদনা তারা বিশ্বকাপ খেলে না কেন? জানিয়েছিলাম পরিকাঠামোগত ভাবে কীভাবে পিছিয়ে রয়েছে আমাদের দেশের ফুটবল।
প্রিয়দা,সুব্রতা, পি কে দা সকলেই মিলে আমরা একসঙ্গে ডেরা বাঁধলাম। নিজেরাই রান্না করে খেতাম। সে যাত্রায় প্রিয়দা আমাকে কিছু টিকিট দিয়েছিল। মারাদোনার খেলা দেখার জন্য উৎসুক ছিলাম। কিন্তু, আর্জেন্তিনা ম্যাচের টিকিট পাচ্ছিলাম না। মিডিয়া সেন্টারের হেডের কাছে গিয়ে মনে বাসনা খুলে বললাম। তিনি এক্কেবারে ভিভিআইপি-দের মধ্যে খেলা দেখার বন্দোবস্ত করে দিলেন। সামনে থেকে বসে দেখলাম ফুটবলের রাজপুত্রের খেলা। মন ভরে গেল। মনে হচ্ছিল এরপর যা কিছু ঘটুক তাতে ক্ষতি নেই।
সে যাত্রায় আমি ১৫টি-র বেশি খেলা দেখেছিলাম। আমি বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না। এরপর একইভাবে আমি ১৯৯৪-এ আমেরিকায় বিশ্বকাপ দেখতে গিয়েছি। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সেও গিয়েছিলাম বিশ্বকাপ দেখতে। এই বিশ্বকাপগুলিতে আমি যেতে পেরেছিলাম স্রেফ উপস্থিত বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে। আমার কাছে বেশি অর্থ ছিল না। খেলা দেখার জন্য প্রচুর কষ্ঠ করেছি। কিন্তু, যতদিন পেরেছি বিশ্বকাপের আঙিনায় বিশ্বসেরা উৎসবকে চেটেপুটে নেওয়ার চেষ্টা করেছি।
আমি যে কটি বিশ্বকাপ দেখেছি তার সবকটিতেই ফিফা অফিসিয়ালদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতাম। কারণ খেলা দেখাও যেমন আমার উদ্দেশ্য ছিল তেমনি ফিফা কীভাবে ফুটবলের উন্নতিতে কাজ করছে সেটাও প্রত্যক্ষ করতাম। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে বেকেনবাওয়ারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আলাপচারিতায় বেকেনবাওয়ার বলেই দিলেন- 'যে দেশ ফুটবল উন্মাদনায় বিশ্বকাপ খেলিয়ে দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে তারা বিশ্বকাপ খেলতে পারছে না! এর মানে নিশ্চয় ভারতীয় ফুটবল কর্তাদের পরিচালন ব্যবস্থায় কোনও সমস্যা রয়েছে।'
সেদিন বেকেনবাওয়ারে মন্তব্যের কোনও জবাব দিতে পারিনি। সত্যি তো এভাবে নিজের গ্যাঁটের পয়সা খরচ করে আমি এতগুলো বিশ্বকাপ দেখলাম অথচ কোনও ক্লাব কর্তাই ডেকে কোনও দিন জানতে চাননি আমি শিখে এলাম। তাহলে হয়তো কিছু অভিজ্ঞতা জানাতে পারতাম। ইটালিকে এফ সি রোমার সঙ্গে আমি অনুশীলনও করেছিলাম। আমেরিকা বিশ্বকাপের সময় সেখানেও প্রথমসারির দলগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে অনুশীলন করেছি। শিখেছি-বোঝার চেষ্টা করেছি যে কোথায় ভারতীয় ফুটবল অন্যান্যদের থেকে পিছিয়ে? ১৯৯৮ সালে মিশেল প্লাতিনির সঙ্গেও পরিচয় হয়েছিল। উন্নত ফুটবল পরিকাঠামো গঠন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনাও হয়েছিল তাঁর সঙ্গে।

এই সময় আরও এক বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে। রুশ দেশের সেই বিশ্বকাপ ঘিরে পারদের মাত্রা চরমে। কিন্তু, এখন আর যেতে পারি না বিশ্বকাপের আঙিনায়। অসুবিধা হয়। কিন্তু, গিয়েও কী লাভ যাদের কাছে আমার এই কাজ মূল্য পেত তারা তো আমার জ্ঞানকে পাত্তাও দেয় না। '
(রণজিৎ মুখোপাধ্যায় একজন বিখ্য়াত প্রাক্তণ ভারতীয় ফুটবলার। কলকাতা ময়দানে একটা সময় বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল তাঁর। ময়দানের প্রধান ক্লাবগুলিতে দাপটের সঙ্গে খেলেছেন তিনি। যে কজন বাঙালি স্ট্রাইকার দেশের ফুটবল ইতিহাসে নজর কেড়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম রণজিৎ মুখোপাধ্যায়। প্রচার বিমুখ, কাজে বিশ্বাসী এই প্রাক্তন ফুটবলারের বাস খড়দহে।)












Click it and Unblock the Notifications