বিরাট কোহলি ভারতীয় দলে বড় ধাক্কা খেতে চলেছেন? ক্ষোভের বিস্ফোরণে তেমনই ইঙ্গিত
টি ২০ বিশ্বকাপের পর ভারতীয় দলের টি ২০ অধিনায়কত্ব ছাড়ার কথা ঘোষণা করেছেন বিরাট কোহলি। প্রাথমিকভাবে এটিকে আচমকা বলে মনে হলেও বিসিসিআইয়ের বিবৃতিতেই স্পষ্ট হয়, গত ছয় মাস ধরে আলাপ-আলোচনা চলছিল। ভবিষ্যতের রূপরেখার কথা ভেবেই বিরাটের এই সিদ্ধান্ত। তবে বিরাট বাকি দুটি ফরম্যাটে অধিনায়কত্ব ধরে রাখতে আগ্রহী হলেও সেটা আদৌ হবে কিনা তা নিয়েও জল্পনা শুরু হয়েছে।

বিরাট-রোহিত সম্পর্ক
বিরাট কোহলি তাঁর বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, রোহিত শর্মার সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর কথা হয়েছে। যদিও বিসিসিআই সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী এটা অস্বীকারের উপায় নেই যে, বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মার মধ্যে শীতল সম্পর্কের জেরে ভারতীয় দলেও বিভাজন স্পষ্ট হয়েছিল। সম্প্রতি ভারতীয় হেড কোচ রবি শাস্ত্রী বলেছিলেন এমন কিছু আছে বলে তিনি উপলব্ধি করেননি। তবে শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যাচ্ছে না নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতের ক্রিকেটারদের অনেকেই ঘনিষ্ঠ মহলে এই বিষয়ে মুখ খোলায়।

কোহলির দাবি খারিজ
বিসিসিআই সূত্রে খবর, অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে বিরাট কোহলি নির্বাচকদের প্রস্তাব দিয়েছিলেন রোহিত শর্মাকে সহ অধিনায়কত্ব থেকে সরানোর জন্য। যেটা একেবারেই ভালো চোখে নেননি নির্বাচকরা এবং বিসিসিআইও। বিরাট চেয়েছিলেন লোকেশ রাহুলকে একদিনের আন্তর্জাতিকে এবং ঋষভ পন্থকে সহ অধিনায়ক হিসেবে পেতে। কিন্তু সেটা তো হয়নি, টি ২০ বিশ্বকাপে রোহিত শর্মাকেই সহ অধিনায়ক ঘোষণা করা হয়। সব কিছু ঠিকঠাক চললে রোহিত শর্মাই টি ২০-তে অধিনায়ক হতে চলেছেন। সুনীল গাভাসকরের মতো প্রাক্তনরা মনে করছেন, লোকেশ রাহুলকে ভবিষ্যতের অধিনায়ক হিসেবে তৈরি করুক বিসিসিআই। সে কারণে আপাতত রাহুলকে সহ অধিনায়ক করা হতে পারে। সহ অধিনায়কত্বের দৌড়ে কিছুটা পিছিয়ে আছেন ঋষভ পন্থ। ডার্ক হর্স আবার জসপ্রীত বুমরাহ।

যোগ্য রোহিত
রোহিত শর্মা নেতৃত্ব দিয়ে ভারতকে সাফল্যও এনে দিয়েছেন। আইপিএলে তিনি সবচেয়ে বেশি পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন করেছেন মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। ফলে রোহিতকে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে অধিনায়ক করার কথা অনেক দিন ধরেই আলোচিত হচ্ছিল ভারতীয় ক্রিকেটে। তবে রবি শাস্ত্রীর সঙ্গে বিরাট কোহলি যে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন তাতে বিরাট যে অধিনায়কত্ব হারাতে পারেন তা এই মুহূর্তে ভাবা কষ্টসাধ্য ছিল। কিন্তু বিসিসিআই সূত্রে খবর, গত অস্ট্রেলিয়া সফর থেকেই চাকা ঘুরতে শুরু করে বিরাটের বিপক্ষে।

সতীর্থদের সঙ্গে দূরত্ব
খোঁজখবর নিয়ে জানা যাচ্ছে, বিরাট কোহলির সঙ্গে যখন তখন মাঠের বাইরে দেখা করা, কথা বলা বা হাল্কা মেজাজে সময় কাটাতে পারেন না সতীর্থ ক্রিকেটাররা। কোচ, নির্বাচক, সাপোর্ট স্টাফ ও বিসিসিআই কর্তাদের আস্থা অর্জন করে বিরাট ভারতীয় দলে একনায়কতন্ত্র বা স্বেচ্ছাচারিতাও শুরু করেন বলে অভিযোগ। তিনি এমন কৌশল নেন যাতে অধিনায়ক হিসেবে তাঁর উত্তরসূরী কেউ তৈরি হতে না পারেন। ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে পাকাপাকিভাবে চার নম্বর পজিশনের ব্যাটসম্যান হিসেবে কাউকে তৈরি করতে চাননি বিরাট। আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে দুই স্পিনার নিয়ে খেলতে নামা কিংবা ইংল্যান্ডে টেস্ট সিরিজে এক নম্বর স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে বসিয়ে রাখাও বিরাটেরই স্বেচ্ছাচারিতার নমুনা বলে জানা যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া সফরে অ্যাডিলেড টেস্টের আগেও বিরাটের হাতেই ছিল নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু তা আলগা হতে শুরু করে ৩৬ রানে অল আউট হয়ে টেস্ট হারার পর। এরপর পিতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে বিরাট দেশে ফিরতেই এককাট্টা হয়ে গোটা দল অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জয় নিশ্চিত করে। এতেই বিরাটের প্রতি দলের অনাস্থা প্রকাশ্যে আসতে থাকে।

ধোনির সঙ্গে মিল
বিসিসিআইয়ের অন্দরমহলের খবর, অধিনায়ক হিসেবে রোহিত শর্মার মধ্যে মহেন্দ্র সিং ধোনির মিল রয়েছে। অধিনায়ক ধোনির দরজা সতীর্থদের জন্য সব সময় খোলা থাকে। সেখানে গিয়ে ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা যেমন করতে পারেন সকলে, তেমনই ভিডিও গেম খেলা কিংবা একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়াও করে থাকেন ধোনি। রোহিতও তেমনই। তিনি যেমন সতীর্থদের সঙ্গে একসঙ্গে খেতে যাওয়া পছন্দ করেন, তেমনই খারাপ সময়ে সতীর্থদের পিঠ চাপড়ে তাঁদের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা করেন। যেটা একেবারেই করেন না বিরাট কোহলি। বিরাটকে কাছ থেকে দেখা এক প্রাক্তন ক্রিকেটারের কথায়, বিরাট শুধু দলের সকলের কমিউনিকেশনের কথা প্রেস কনফারেন্সে এসেই বলেন। নিজে তার কিছুই মানেন না।

হাওয়া বুঝেই সিদ্ধান্ত
বিরাট কোহলিও উপলব্ধি করছিলেন রবি শাস্ত্রী চলে গেলে নতুন কোচ এলে তাঁর কী হবে সেই পরিস্থিতির কথা। সুনীল গাভাসকর যেমন পরিষ্কার বলে দিয়েছেন বিসিসিআইয়ের কোচ ঠিক করা উচিত নিজেদেরই, ক্রিকেট অ্যাডভাইসরি কমিটির পরামর্শ পেয়ে তা খতিয়ে দেখে। প্রফেসর বা প্রিন্সিপাল কাকে করা উচিত সে ব্যাপারে ছাত্রের যেমন মত নেওয়া হয় না, তেমনটাই কোচ ঠিক করার সময় হওয়া উচিত। ফলে নেতৃত্ব ছাড়ার আগে বিরাট রবি শাস্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ শলাপরামর্শ করেন বলে খবর। বিরাট নিশ্চিতভাবেই বুঝছিলেন, আজ নয় কাল তাঁর সাদা বলের অধিনায়কত্ব চলে যাচ্ছেই। একটিও আইসিসি ইভেন্টে দলকে চ্যাম্পিয়ন করাতে পারেননি কোহলি। তাই টি ২০ বিশ্বকাপেও খারাপ কিছু হলে এমনিতেই অধিনায়কত্ব যেত। আগে তা ঘোষণা করে কিছুটা মুখরক্ষা করলেন এবং নিজের উপর চাপ কমালেন।

বড় পরিবর্তন আসছে
বিসিসিআইয়ের এক কর্তা বলেছেন, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ও জয় শাহ বিবৃতিতে একবারও নিশ্চয়তা দেননি বিরাটকে একদিনের আন্তর্জাতিকে অধিনায়ক রাখার। এমনকী টেস্টেও। সৌরভ লিখেছেন, বিরাটের ব্যাটে আরও অনেক রান দেখতে চাই। বিরাট নিজে যদিও চাইছেন ২০২৩ সালে আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল ও ৫০ ওভারের বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দিতে, কিন্তু ততদিন তিনি অধিনায়ক থাকবেন সে ব্যাপারে নিশ্চয়তা এখনও নেই। অনেক কিছুই নির্ভর করছে টি ২০ বিশ্বকাপের ফলের উপর। বিরাট নিজেও চাইছেন সচিন তেন্ডুলকরের একশোটি শতরানের রেকর্ড ভাঙতে। টেস্টে সচিনের শতরানের রেকর্ড ভাঙা সম্ভব না হলেও বিরাট একদিনের আন্তর্জাতিক বা টি ২০ আন্তর্জাতিকের মাধ্যমে শতরানের সেঞ্চুরি করতেই পারেন। ফলে আপাতত নিজের ব্যাটিংয়ে মনোনিবেশ করে সেই রেকর্ডই পাখির চোখ হবে বিরাটের। বিরাটের বিরোধী শিবিরের কটাক্ষ, চিরকাল সবার সময় সমান যে যায় না তা খুব দ্রুতই উপলব্ধি করতে হচ্ছে বিরাটকে।












Click it and Unblock the Notifications